যুদ্ধ আর পর্নোগ্রাফির নতুন আগ্রাসন

প্রতীকী ছবি
যুদ্ধ নিজেই তো এক নগ্ন দানব। তার রক্তচক্ষু, তার ধারালো নখ, ধারালো দাঁতের আগ্রাসন পৃথিবীর মানুষকে উৎক্ষিপ্ত, উদ্বাস্তু করেছে যুগ যুগ ধরে। গণমাধ্যমে খবর মিলছে, এবার সেই ভয়ংকর ও প্রলম্বিত যুদ্ধে কোনঠাসা হয়ে পড়া ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ভর করবে পর্নোগ্রাফির ওপর। এ ধরণের যৌন-ছবির ওপর কর আরোপ করে তারা সেই অর্থ নিজেদের সামরিক ব্যয়ে যোগ করার কথা চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের আগুনে তারা পুড়ছে বহুদিন ধরেই। অস্ত্র, গোলাবারুদ, ভাড়াটে সৈন্য এবং বিশেষ করে ড্রোনের মতো আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনতে তাদের ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি বাজেটের ঘাটতি। রাজধানী কিয়েভে বসে থাকা সরকার তাই সম্ভবত সক্রিয় হয়ে উঠতে চাইছে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ অভিযানে।
এক যুদ্ধের নগ্নতা আশ্রয়ের জন্য অন্য আরেক নগ্নতার আচ্ছাদনের তলায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে এমন নজির পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে কম। যুদ্ধ এবং পর্নোগ্রাফির মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটিকে ধারণার আকার দিয়ে এক করে ফেলা না গেলেও আগ্রাসনের বিবেচনায় যুদ্ধকে এক ধরণের পর্নোগ্রাফিক আগ্রাসন বলে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েই যায়। পর্নোগ্রাফিতে একজন ব্যক্তি মানুষ (নারী অথবা পুরুষ) কামনা নিরসন অথবা উসকে দেওয়ার বস্তুতে পরিণত হয়। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এ একই ধারণা ভিন্নভাবে একই ছকে বসে যায়। সেখানে প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তারা পরিণত হয় আক্রমণের লক্ষ্য। শত্রুকে বস্তুতে পরিণত করতে না পারলে তাকে হত্যা করা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধ যুদ্ধ; যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন; দিন শেষে পর্নোগ্রাফি আর যুদ্ধ দুইয়ের মধ্যেই কাজ করে আধিপত্ত বিস্তারের মনস্তত্ত্ব। এবার যদি ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর যুক্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিকে করযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত শিল্পে পরিণত করে তবে দুই ধরণের আধিপত্যবাদের মনস্তত্ত্ব নিজেদের জায়গা দখলের ভিন্ন এক যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
পর্নো ছবির ওপর কর আরোপ করার এই ধারণার প্রবক্তা দেশটির বিরোধী দলের নেতা ইয়োরোস্লাভ জেলেজনিয়াক। তার হিসাব অনুযায়ী যৌনতার এই শিল্পকে নিয়মিত অর্থনীতির কাঠামোর ভেতরে জায়গা করে দেওয়ার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, তা থেকে বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। আর এ অর্থ দিয়ে কিনে ফেলা যাবে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন।
জেলেজনিয়াকের মাথায় এই পরিকল্পনাটি এসেছিল ২০২৩ সালের একটি পরিসংখ্যানের তথ্য থেকে। সেখানে দেখান হয়েছে, ‘অনলি ফ্যানস’ নামে ইউক্রেনের একটি পর্নো-প্ল্যাটফর্ম থেকে ইউক্রেনের ৭,৯০০ জন মোট ১৩১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ নিজেদের পকেটে তুলে নিয়েছে।
পৃথিবীতে যুদ্ধের ইতিহাসে এ ধরনের নজির খুব বেশি দেখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনাবাহিনী ‘কমফোর্ট ওমেন’ নামে জোরপূর্বক যৌনদাসী প্রথা চালু করেছিল। তবে তখন কর সংগ্রহ করার চাইতে নারীদের জোর করে যুদ্ধের একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রতিপক্ষকে কুপোকাৎ করার জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে যৌনকর্মীদের কর্মকাণ্ড ছিল আধিপত্যবাদী ভাবনার বিপরীত। তারা তাদের নিবন্ধন ফি এবং এবং স্থানীয় বিভিন্ন কর নিয়মিত প্রদান করত যুদ্ধ খাতে অর্থ জোগান দিতে।
যদি ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিকে করযোগ্য নিয়ন্ত্রিত শিল্পে পরিণত করে ফেলে তাহলে ইউরোপের মাটিতে যৌন ব্যবসা আরেকটি নতুন যুদ্ধের ক্ষেত্রকে উন্মোচিত করবে তাতে সন্দেহ নেই। সেখানে তখন বিভিন্ন দেশের সরকার এ যৌনবাজারকে অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে না রেখে করের আওতায় এনে ফেলার কথা ভাবতে শুরু করবে। বৃদ্ধি পাবে নারী পাচার, যৌনশোষণ। বিস্তৃত হবে পর্নোগ্রাফির মঞ্চ। অনিরাপদ হয়ে উঠবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে শিশুদের ভবিষ্যত। ভবিষ্যত পৃথিবীতে যুদ্ধরত আরও অন্য দেশগুলো এ পন্থা বেছে নিতে শুরু করবে যুদ্ধের ব্যয় বহন করার জন্য। ভবিষ্যতের যুদ্ধবাজদের এক যুদ্ধের আগুন উসকে দেবে অন্য এক রণক্ষেত্রকে, যেখানে আবারও লজ্জাহীন আগ্রাসনই হয়ে উঠবে শেষ কথা।



