নেপাল ও নিনিয়ো

নেপালের প্রলয়ঙ্করী পাহাড়ি ঢল সকলের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছে। সেটা শুধু হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশগুলোর না। সারা বিশ্বের। নেপালের ঘটনায় যে জিনিশটা আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, তা হলো: প্রকৃতির প্রচণ্ড রূপের কাছে মানুষ অসহায়। তার সভ্যতা, তার নগর-বন্দর, সেতু, কনক্রিটের বাঁধ, তার শান-শওকত খরকুটোর মতো ভেসে যায় প্রকৃতির সামান্য ফুঁয়ে।
এই ঢল কোনো জানান না দিয়ে হঠাৎ কী করে হাজির হলো, এ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। কারণ যাই হোক না কেন, এরকম আরও অনেকগুলি জনপদনাশী দুর্যোগ যে আমাদের সামনে অপেক্ষমান এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। এটাকে আমরা দেখছি আলামত হিসেবে, আরও বড় কিছুর আলামত।
আমরা জানি, সব কিছুর পিছনে যে মহা কারণ, সেটা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। আমাদের পৃথিবীটা ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে। তা ঘটছে আমাদেরই আয়েশী জীবনযাপনের কারণে। আমজনতার ভাষায় বললে বলতে হয়, আমরা মোটরগাড়ি চড়ে আর এসির বাতাস খেয়ে দুনিয়াটাকে গরম করে তুলছি।
নেপালের ঘটনা যখন ঘটছে, তখন বিশ্বের আরও বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক দুর্যোগ হানা দিয়ে চলেছে। ইউরোপ জুড়ে চলছে খরা আর দাবানল। এশিয়ায় দেশে দেশে এবার অস্বস্তিকর গরম পড়েছিল। সেই সঙ্গে অতিবর্ষণ। আর সবার অগোচরে প্রশান্ত মহাসাগরের পানি উষ্ণ হচ্ছে। এই ঘটনার একটা আনুষ্ঠানিক নাম আছে। এল-নিনো। আমরা বাংলা সংবাদপত্রের সূত্রে ‘এল-নিনো’ লিখি বটে, তবে স্প্যানিশ এই শব্দ-যুগলের সঠিক উচ্চারণ হবে ‘এল-নিনিয়ো’। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। আফ্রিকার ডেঙ্গি রোগ আমাদের বাংলা সংবাদপত্রের নিউজরুমের দক্ষতায় সেই যে ডেঙ্গু হয়ে গেল, এখন সেটা নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে গেছে।
আমি এখানে এল-নিনিয়োই লিখছি। অভ্যাস হোক। বলা হচ্ছে, এবারেরটা সাধারণ এল-নিনিয়ো নয়। এটা এক সুপার বা মহা এল-নিনিয়ো। এর প্রভাবে আরও বড় বড় প্রলয়কাণ্ড ঘটবে। একের পর এক।
এল-নিনিয়ো কোনো ঘূর্ণিঝড় নয়। এটা হলো আবহাওয়ার এমন এক বৈশ্বিক প্যাটার্ন বা চক্র, যেখানে বিষুবীয় অঞ্চলে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উপরিপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে ওঠে।
পানি গরম হলে কী হয়? পানির উপরের বায়ুও গরম হয়ে ওঠে। ফলে সমুদ্রবায়ুর প্রবাহ ওলট-পালট হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার প্যাটার্নটাই বদলে যায়। এল-নিনিয়ো হলো পৃথিবী গ্রহের বাৎসরিক আবহাওয়ার নিয়মিত বিন্যাসে একটা ব্যত্যয়। একটা গোলমাল। তবলার তালে একটা বেতাল চাটি। কবিতার ভিতরে ছন্দপতন। কম্পিউটার প্রোগ্রামে ‘বাগ’।
কয়েক বছর পর পর এরকম এল-নিনিয়ো ঘটে। তবে বলা হচ্ছে এবারেরটা নাকি অনেক বড় পরিসরের। কারণ এবার প্রশান্ত মহাসাগেরর তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাবে। কেউ কেউ এটাকে সুপার এল-নিনিয়ো বলছেন। যেহেতু সাগর থেকেই এ গোলমালের সূত্রপাত, তাই কেউ কেউ এটাকে গডজিলা এল-নিনিয়ো নামে ডাকছেন। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, আগামী অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসে এটার প্রভাব সবচেয়ে প্রকট রূপ নেবে।
কী কী ঘটতে পারে এই এল-নিনিয়োর প্রভাবে?
প্রথমত, দুনিয়াটা এমনিতেই গরম হয়ে উঠছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বরাতে। এল-নিনিয়ো সেই আগুনে তুষ ছিটাবে। তার মানে অনেক জায়গায় এবার গায়ের চামড়াপোড়া গরম পড়বে। কোথাও দেখা দিবে তীব্র খরা। ফসল পুড়ে খাক হবে। কোথাও কোথাও দাবানল ছড়িয়ে পড়বে। আবার কোথাও অতিবর্ষণের কারণে দেখা দেবে বন্যা। সমুদ্রে গজিয়ে ওঠা ঘূর্ণিঝড়গুলো আরও প্রকাণ্ড রূপ নিয়ে ধেয়ে আসবে ডাঙার দিকে।
এসবের একটা সম্মিলিত পরিণাম হলো ফসলহানি। এবার বিভিন্ন মহাদেশে ধান, গম, ভুট্টা, আখ ইত্যাদি ফসলের ফলন অনেক কমে যাবে। ফলে বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে খাদ্যাভাব। খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যাবে।
এ খবর আমাদের জন্যে বড় দুঃসংবাদ। কারণ, এল-নিনিয়োর প্রভাব এমন এক সময় দেখা দিচ্ছে, যখন বাংলাদেশ তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছে। সহসা এ থেকে নিস্তারের পথ চোখে পড়ছে না। যদি খরা হয়, আমাদের সেচে বড় ঘাটতি পড়বে। বিশ্ববাজারে শস্যের দাম বেড়ে গেলে সেটা ভালো সংবাদ হবে না মোটেও।
অতীতেও এল-নিনিয়োর পরপরই দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮৭০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ভারতবর্ষের ছয়টি বড় বড় দুর্ভিক্ষের তিনটির সঙ্গে এল নিনিয়োর যোগ আছে।
সমস্যা একটাই। দুর্যোগ সবার জন্যে সমান না। যারা সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে নিরীহ, দুর্ভোগের প্রধান ভাগিদার তাদের হতে হয়। এবার নেপালের ঘটনায় এই কথাটা সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে। সবাই বলছে, অন্যের পাপের ফল নেপালকে ভোগ করতে হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে নেপালের দায় সবচেয়ে কম। অথচ যে প্রায়শ্চিত্য তাদের করতে হলো, তা অবর্ণনীয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ কথা খাটে। দুর্যোগে দুর্গত হওয়াই যেন আমাদের নিয়তি।







