শতবর্ষে অগ্নিশিখা ইলা মিত্র

ইলা মিত্র। ছবি: সংগৃহীত
তার হাতে ধরা ছিল না কোনো শক্তিশালী মারানাস্ত্র। কিন্তু তার সঙ্গে ছিল কৃষকের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হাজার হাজার মুষ্টিবদ্ধ হাত। এই দেশের মাটি থেকে তিনি উত্থিত হয়েছিলেন, কৃষকের ফসলের অধিকার নিশ্চিত করার এক ভীষণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন চল্লিশের দশকে। ক্ষমতার একচক্ষু দানবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, নির্যাতন সহ্য করেছিলেন; কিন্তু কৃষকের অধিকার আদায়ের যুদ্ধের যে মাঠ সেখান থেকে কখনো সরে আসেননি। বন্দুক, লাঠি, থানার লক-আপে রাতের পর রাত অবর্ণনীয় নির্যাতন সেই অশম্পিত অগ্নিশিখাকে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিতে পারেনি। বরং কমিউনিস্ট এই বিপ্লবীকে পৌঁছে দিয়েছে ইতিহাসের দরজায়। এই জন্মের নাম ইলা মিত্র।
এ বছর পালিত হবে এই অবিস্মরণীয় নেত্রীর জন্মশতবার্ষিকী।
ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। বাবা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। পড়াশোনা বেথুন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হতে পারতেন শিক্ষক, ভালো খেলোয়াড় অথবা অভিনয় শিল্পী। কিন্তু তার গভীর রাজনৈতিক ভাবনা এবং দেশের মানুষের প্রতি আনুগত্য তাকে পৌঁছে দেয় তখন দানা বেঁধে ওঠা রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঠে। সেই সংগ্রামে তিনি ভীত হয়ে পিছিয়ে আসেননি কখনো। মানুষের অধিকার আদায়ের পথ যে তৈরি করে নতুন মানুষ তা তিনি বুঝেছিলেন। অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে। অংশ নিয়েছিলেন বিখ্যাত তেভাগা আন্দোলনে। হয়ে উঠেছিলেন এক অবিস্মরণীয় নেত্রী। তার কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল—জমি যার, ফসলের ন্যায্য অধিকারও তার। ইলা মিত্রের কন্ঠস্বর জাগিয়ে তুলেছিল অধিকার বঞ্চিত কৃষকদের। ফসলের ন্যায্য অধিকারের লড়াই পরিণত হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগ্রামে।
অন্ধকার কারাগার, থানার লকআপে নিষ্ঠুর নির্যাতন তাকে ঘিরে ধরেছিল। তার শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। কিন্তু ইলা মিত্রকে দমন করা যায়নি। তার যন্ত্রণা, তার চোখ থেকে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়া দীর্ঘশ্বাস একজন নারীর ব্যক্তিগত বেদনাবোধে সীমিত হয়ে থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার কৃষকদের বুকের গভীরে। রাজশাহী আদালতে ১৯৫০ সালে করা মামলার নথিতে ইংরেজি ভাষায় লেখা ইলা মিত্রের জবানবন্দির অনুলিপি থেকে জানা যায় তার ওপর চালানো নির্মম অত্যাচারের বিবরণ। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘বিগত ০৭.০১.৫০ তারিখে আমি রোহানপুর থেকে গ্রেপ্তার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল থানা হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়। পথে পাহারাদার পুলিশ আমার ওপর নির্যাতন চালায়। নাচোলে ওরা আমাকে একটি সেলের মধ্যে রাখে। সেখানে পুলিশের একজন দারোগা এই মর্মে আমাকে ভীতি প্রদর্শন করে যে, পুলিশ হত্যা সম্পর্কে যদি সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি না করি, তাহলে ওরা আমাকে উলঙ্গ করবে। আমার যেহেতু বলার মতো কিছু ছিল না, কাজেই তারা আমার পরনের সমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় সেলের মধ্যে আটকে রাখে। আমাকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি’’।
তার জবানবন্দি আরও জানায়, সেই সন্ধ্যায় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পুলিশ ইলা মিত্রের ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং তাকে থানার মধ্যেই ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করতে ব্যর্থ হয় শাসকের নির্যাতন চক্র।
প্রশাসনের দৃষ্টি এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া নেত্রী ইলা মিত্র পুলিশের হাতে ধরা পড়েন রহনপুর রেলস্টেশনে। তার ধরা পড়ে যাওয়া নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে। একটি হলো—পথ ভুল করে তিনি রহনপুর স্টেশনে পৌঁছান। অন্যটি হলো—তিনি তখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীর ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন গেপ্তার এড়াতে। কিন্তু কথিত রয়েছে, টিকেট কাউন্টারে গিয়ে ইংরেজিতে কথা বলে ফেলায় তিনি ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, হাতে ঘড়ি থাকার কারণে পুলিশের গুপ্তচরেরা তাকে চিনে ফেলেছিল।
ইলা মিত্রের গল্প আজও কিংবদন্তি বাংলাদেশে। কিন্তু তার জীবন তো কিংবদন্তির চাইতেও বেশি রাজনৈতিক এবং আদর্শিক আনুগত্যের। আদর্শের লড়াই থেকে ইলা মিত্র কখনোই পিছিয়ে আসেননি। নবান্নের ঘ্রাণে আচ্ছন্ন মাঠ পার হয়ে তিনি এসেছিলেন অধিকারহারা কৃষকের উঠানের আপনজন হয়ে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাকে আজও বসিয়ে রেখেছে এক অনন্য আসনে। বাংলাদেশের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে ইলা মিত্র আজও এক অনন্য অগ্নিশিখা। জন্মের শতবর্ষ পরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আকাশে উৎক্ষিপ্ত কোনো মুষ্টিবদ্ধ হাত ধরে আছেন একজন ইলা মিত্র।





