হকিংয়ের বাবার ডায়েরি

বাবা ফ্র্যাংক হকিংয়ের কোলে শিশু স্টিফেন হকিং (বামে) এবং পরবর্তী জীবনে স্টিফেন হকিং
আলোচিত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং একবার বলেছিলেন, ‘মানুষের উচিত নিজের পায়ের পাতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না রেখে আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকানো।’ তিনি নিজেও তাই করেছিলেন বলেই মহাবিশ্বের জটিল বিকাশ, কৃষ্ণগহ্বর আর তার গাণিতিক প্রমাণ তার গবেষণার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২১ বছর বয়স থেকে মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হন তিনি। রোগের প্রভাবে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হকিংসের হুইলচেয়ারে বসেই কেটে গেছে জীবনের বেশিরভাগ সময়। কিন্তু আশ্চর্য ভাবে সচল তার মস্তিষ্ক খনন করেছে জ্ঞানের গভীর তলদেশ। আলো ফেলেছে রহস্যময় এলাকাগুলোর ওপর।
মহাবিশ্ব, কৃষ্ণগহ্বর, মহাকর্ষ সম্পর্কিত তত্ত্ব এবং তার গাণিতিক প্রমাণ আবিষ্কার করে পৃথিবী জুড়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। কিন্তু অচমকা আবিষ্কৃত একটি ডায়েরি আমাদের জানাচ্ছে, স্কুল জীবনে এবং আরেকটু বড় হওয়ার পর পর্যন্ত হকিং ভীষণ অলস ছিলেন। বেশিরভাগ সময় তিনি বাড়িতেই বসে থাকতেন এবং লেখাপড়ার দিকে তার কোনো মনযোগ ছিল না।
সম্প্রতি সেই ডায়েরির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। হকিংয়ের বাবা ফ্র্যাংক হকিং ডায়েরিতে অনেক কিছুই লিখে গেছেন সাংকেতিক ভাষা অনুসরণ করে। এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হবে স্টিফেন হকিংয়ের আত্মজীবনী গ্রন্থ। বইটি লেখার কাজ করেছেন লেখক, গবেষক গ্রাহাম ফারমেলো। বইটির প্রকাশক জন মুরে জানিয়েছেন, এই নন্দিত বিজ্ঞানীর আত্মচরিত রচনার কাজ করতে গিয়ে ফারমেলোকে প্রচুর গবেষণা এবং বিজ্ঞানীর বাড়িতে পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটার কাজ করতে হয়। সেখানেই তিনি ফ্র্যাংক হকিংয়ের ডায়েরির সন্ধান পান। এত বছর ধরে সেটি হকিংয়ের বোন মেরির কাছে সংরক্ষিত ছিল। খুঁজতে খুঁজতে শুধু ডায়েরিই নয়, তার হাতে চলে আসে হকিংয়ের মা ইসোবেলের লেখা অনেক চিঠি এবং জার্নাল।
কিন্তু ১৯৬১ সালে হকিংয়ের বাবা যখন ডায়েরি লিখছিলেন, তার কোনো ধারণাই ছিল না তার ছেলেটি একদিন খ্যাতির শিখরে উঠে যাবে। তিনি ওই বছর ডায়েরিতে লিখেছেন, ছেলের অলসতা আর অমনোযোগিতার বিষয়টি তাদের পরিবারের সবাইকে ক্রমশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলছে। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘‘তার মা ইসোবেল আমাকে সেদিন বলছিল হকিংয়ের মনে এক ধরনের হিনমন্যতা তৈরি হয়েছে। অক্সফোর্ডে পদার্থবিজ্ঞান পড়ার বিষয়ে তার আগ্রহ চলে গেছে। আমি শুধু ভাবি, তার বয়সে এই সুযোগ যদি আমি পেতাম তাহলে অনেক ভালো কিছু করতে পারতাম।’’।
ফ্র্যাংক হকিং প্রায় ষাট বছর ধরে ডায়েরি লিখেছেন। সেখানে বহু কথা তিনি লিখেছেন সাংকেতিক ভাষায়। মজার বিষয় হচ্ছে ফারমেলো গ্রিক ভাষায় লেখা সেই সাংকেতিক ভাষার বেশির ভাগের পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রাচীন গ্রিক সাংকেতিক ভাষার ২০০,০০০ শব্দ তিনি অনুবাদ করেছেন ইংরেজিতে। তিনি গণমাধ্যমকে বইয়ের আলোচনার সময় জানিয়েছেন, ডায়েরিতে হকিংয়ের ছেলেবেলা, তার অসুস্থতা, বিয়ে এবং পদার্থবিজ্ঞানী জীবনের অনেক তথ্য তার বাবা লিখেছেন যা তথ্য হিসেবে এতদিন ছিল অজানা।
ডায়েরির অন্য এক জায়গায় ছেলের অসুস্থতার বিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমার কাছে গোটা বিষয়টা খুব বাজে একটি অনুভূতি। ধীরে ধীরে স্টিফেন যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে। তার সব কাজকর্ম মন্থর হয়ে আসছে শারীরিক ভাবে। আজকাল তার কথা বোঝাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আমার ভীষণ মন খারাপের মধ্যেও ওর জন্য যতদূর করা সম্ভব করছি। কিন্তু আজকাল স্টিফেনের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে না।’
ফারমেলো হকিংয়ের আত্মজীবনী লেখার জন্য হকিংয়ের বোন মেরি ও ফিলিপার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলেছেন। তিনি হকিংয়ের প্রথম স্ত্রী জেনিরও দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাদের সংসারের খুটিনাটি বিষয়গুলো জানার জন্য। চলতি মাসের শেষের দিকে বইটি বাজারে আসবে বলে প্রকাশক সূত্রে জানা গেছে।




