রিফাতরা ফোনে জানায় আমরা এখন একদফা দিব না : কাদের

আব্দুল কাদের
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শেষের দিকে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়েই কোটা সংস্কার আন্দোলন চূড়ান্তভাবে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
সেই ঘোষণা নিয়ে এবার বিস্ফোরক দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। ‘এক দফা’ ঘোষণার নেপথ্যের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে আজ সোমবার ফেসবুকে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন তিনি।
কাদের লিখেন, ‘১ তারিখ বৃহস্পতিবার ৬ সমন্বয়ক ডিবি হেফাজত থেকে মুক্ত হন। বের হওয়ার পরে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি, ব্যক্তিগতভাবে দুই-একজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা চারজন- মাহিন, মাসুদ, রিফাত এবং আমি আমাদের মতো করেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী দিন ২ তারিখ শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা করে দিয়েছি। কিন্তু এই কর্মসূচি ঘোষণা করা নিয়ে ডিবি ফেরত সমন্বয়কদের একাংশ আমাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমার সঙ্গে জড়ায়। সন্ধ্যা নাগাদ সেটা গুরুতর হয়। বাকবিতণ্ডা নিরসন এবং পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে পরদিন জুমার পরে অনলাইনে মিটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
তিনি জানান, ‘বলে রাখা ভালো, শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা নিয়ে নানান বাধা আসলেও ওইদিনের কর্মসূচির ইম্প্যাক্ট ছিল সুদূরপ্রসারী। জুমার পরে সারাদেশে মানুষজন রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিলে নেমে আসে। বিশেষকরে চট্টগ্রাম শহরে। ওইদিনই মানুষজনের মুখে বেশি উচ্চারিত স্লোগান ছিল, ‘দফা এক দাবি এক, খুনী হাসিনার পদত্যাগ।’ সারা দেশে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি একটা স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম, ‘আমরা শিগগিরই চূড়ান্ত ডাক দিচ্ছি। পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুমার নামাজের পর অনলাইন মিটিং শুরু হলো। মিটিং এ কেবল তৎকালীন ছাত্রশক্তির নেতৃবৃন্দ-ই ছিলেন। হাসনাত-সার্জিস ভাই ছিলেন না। প্রথম এজেন্ডা ছিলো, আন্দোলন কন্টিনিউ করা হবে কি না। এক-দুইজনের বিচ্ছিন্ন মতামত বাদে বাকি সবাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়।’
আন্দোলনের কৌশল নিয়ে তিনি লিখেন, ‘দুই নাম্বারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, আমি, মাসুদ, রিফাত, মাহিন আগামী তিন-চারদিন আন্দোলন পরিচালনা করব আগের মতোই, সিনিয়ররা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন; আপাতত তারা পেছনে থাকবেন। আলোচনার মধ্যে আমি আর রিফাত এক দফার ব্যাপারে সিনিয়রদের কনসার্ন জানাই এবং তাদের মতামত জানতে চাই। আমি মাঠের পরিস্থিতি তুলে ধরি, পেশাজীবি-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী এবং শিল্পি সমাজের সরাসরি মাঠপর্যায়ে একাত্মতা পোষণের দিক, সলিমুল্লাহ খানের সরকারের ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগের বক্তব্য এবং চলমান দ্রোহযাত্রার বিষয়ে তাদেরকে অবহিত করি। আমাদের কনসার্নের প্রেক্ষিতে আরো সাত-দশদিন দেখে, এক্সপেরিমেন্ট করে তারপর একদফায় পৌঁছানোর মতামত আসে আলোচনা থেকে। মোটাদাগে এই তিনটা বিষয়ে আলাপ হয়। সর্বশেষ, পরদিন (তিন তারিখে) অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয় মিটিংয়ে।’
তিনি লিখেন, ‘সেই দীর্ঘ অনলাইন মিটিং শেষ বিকাল পর্যন্ত কন্টিনিউ হয়। এরমধ্যে আমার বাসায় এক নারী সাংবাদিক আর ওয়াহিদ আলম নামে দুইজন ব্যক্তি আসে। মিটিং শেষ করে আমি তাদের সঙ্গে আলাপ করতে বসি। উনারা নতুন কেউ না, আগে থেকেই কানেক্টেড ছিলাম আমরা। আন্দোলনের কর্মসূচি, তাদের বাসায় সমন্বয়কদের নিরাপত্তা দেওয়াসহ অনেক বিষয়ে তারা যুক্ত ছিলেন। আলাপের এক পর্যায়ে তারা সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এক দফা দেওয়ার বিষয়ে আমাকে পরামর্শ দেয়। এরই প্রেক্ষিতে আমি আমার পরিচিত আসপাশের কিছু মানুষের থেকে খোঁজ খবর নিই, পরামর্শ নিই।’
সিদ্ধান্ত নিতে দেশের অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন জানিয়ে আব্দুল কাদের লিখেন, ‘গতানুগতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমি ছাত্রদলের রাকিব-নাসির ভাই এবং শিবিরের সাদিক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদেরকে একদফার বিষয়ে জানাই। সবকিছু শুনার পরে নাসির ভাই বললো, ‘তাহলে এই ব্যাপারটা আমি চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে আলাপ করে নিই।’ আর সাদিক ভাই বললো, ‘আমি তাহলে মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনা করে তোমাকে জানাচ্ছি।’ এরমধ্যে মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়ে সন্ধ্যা গড়াচ্ছে। যে দুইজন আমার বাসায় আসে, তাদের সঙ্গে আমি আলাপ করি যে, ‘আমি এক দফার বিষয়ে প্রস্তুত, শিবির-ছাত্রদলের সঙ্গেও আলোচনা করেছি, তারাও মোটামুটি পজিটিভ, তারা তাদের মাদার পার্টির সঙ্গে আলোচনা করতেছে; তবে আমি একা পারব না, বাকি তিন সমন্বয়ক- রিফাত, মাহিন, মাসুদের সম্মতিও লাগবে। আমরা চারজন একসঙ্গে দিব।’
নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে তিনি লিখেন, ‘পরবর্তীতে সেই তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তারা সবাই একসঙ্গে এক বাসায় থাকে। তাদেরকে একদফার ব্যাপারে জানানোর পরে তারা জানায় যে, সিনিয়ররা এখন ডিবি থেকে বের হইছে, এক দফার বিষয়ে সিনিয়ররা সিদ্ধান্ত নেবে। একপর্যায়ে তারা পরিস্থিতির আলোকে তাদের নিজেদের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে কনসার্ণ জানায়। তারা যেখানে অবস্থান করতেছেন, সেখানটায় তারা যথাযথ নিরাপদ মনে করতেছেন না, তাদেরকে সপরিবারে অ্যাম্বাসিতে নিরাপত্তা দিলে তারা একদফার বিষয়ে আগাতে পারেন। এমনটাই তারা জানায়। আমি তাদেরকে সার্বিক পরিস্থিতি এবং দুপুরের মিটিং এ সিনিয়রদের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয় উল্লেখ করে বুঝানোর চেষ্টা করি, এমন পরিস্থিতি আরো সাত-দশদিন কন্টিনিউ করলে অনেক বেশি প্রাণহানি হবে। আর মানুষের জীবন নিয়ে তো আমরা এক্সপেরিমেন্ট চালাতে পারি না। যে কথা দুপুরের মিটিংয়েও আমি বলেছিলাম। তাদেরকে বলি, এক দফায় উপনীত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সিদ্ধান্তের দোলাচালে ঝুলে না থেকে আমরা এক দফা দেই, এক দফা দেওয়ার পর যা হওয়ার হবে। আরেকটা বিষয় বলে রাখি, এরমধ্যে আমি এক জায়গা থেকে খবর পাই, পরবর্তী দিন তিন তারিখে হাসিনা ছল-চাতুরী করে নয় দফা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যেটা আমাকে এক দফার ব্যাপারে আরও তাড়না জোগায়।’
এক দফা নিয়ে কাদের জানান, ‘একপর্যায়ে রিফাতরা একদফা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই দিকে আমরা এক দফার ঘোষণা পত্র খসড়া করে ফেলি। খসড়া করে ওই নারী সাংবাদিকের এক কলিগ। সংযোজন বিয়োজন করে ওয়াহিদ ভাই। পরবর্তীতে আমি সেটা রিফাতদের পাঠাই, তারা কয়েকটা বিষয়ে আপত্তি জানায়। সেসব বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজনের কাজ চলতে থাকে। আমিও এরমধ্যে ছাত্রদল-শিবির সহ অন্যান্য মানুষের সঙ্গে আলাপ চালাইতে থাকি। উপস্থিত বাকিরাও সেইম কাজ করতে থাকে। চারদিক থেকে খোঁজ খবর নিচ্ছে, কনফার্ম হয়ে আগাচ্ছে। বলে রাখা ভালো, এই পুরাটা সময় আমি ডিবি ফেরত কোনো সিনিয়রদের সঙ্গে এক দফার বিষয়ে যোগাযোগ করি নাই, পরবর্তীতেও না। কারণ, দুপুরের তিনঘণ্টার মিটিং এ তাদের সিদ্ধান্ত তো তারা জানায়া দিছে, সেই অভিজ্ঞতার কারণে আমি আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি নাই। এটা আমার ভুল কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, সেটা আমি বলতে পারব না। তাছাড়া তখন তাদেরকে ফোনেও পাওয়া দুষ্কর ছিল। নাহিদ ভাই তার বাবার একটা হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্ট ব্যবহার করতেন, প্রায় সময় বন্ধ থাকতো, যেটাতে তাকে তখন রিচ করা কষ্টসাধ্য ছিল।’
কাদেরের দাবি, ‘এসব করতে করতে রাত দশটা। ছাত্রদলের নাছির ভাই ফোন করে জানায়, ‘একদফা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হইছে, যেটা চেয়ারম্যান স্যারও জানিয়েছেন। তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারো। সাদিক ভাইও একটা পর্যায়ে জানায়, ‘এটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, তুমি হাজতের নামাজ পড়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও, আমাকে জানাও, একদফার বিষয়ে আমরা প্রস্তুত।’
ওই নারী সাংবাদিকের সঙ্গেও এই ব্যাপারে সাদিক ভাইয়ের কথা হইছে। পরে তাদের দুই দিকের সম্মতির প্রেক্ষিতে আমরা কাজ আরো আগাই, ঘোষণা পত্র তাদের সঙ্গে শেয়ার করি, আলোচনা করি। শেষে আমি ঘোষণার একটা ভিডিও বানিয়ে ফেলি। এরইমধ্যে রিফাতরা হঠাৎ করে আর ফোন ধরছে না।
একটা পর্যায়ে ফোন ধরে বলে, ‘নাহিদ ভাইদের সঙ্গে কথা হইছে, তারা এই ব্যাপারে সম্মতি দেয় নাই।’ রিফাত-মাসুদরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় আমরা আকষ্মিকভাবে হতভম্ব হয়ে যাই; তাদের সম্মতির ভিত্তিতে এই দিকে সব রেডি! রিফাতদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, তারা ফোন ধরে আবার ধরে না।’
আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাহিদ ইসলামকে ফোনে না পাওয়া নিয়ে কাদের লিখেন, ‘৫ আগস্টের পরে নাহিদ ভাইদের থেকে জানতে পারি যে, রিফাতরা নাহিদ ভাইকে ফোনে পাওয়ার পরে জানাইছে যে, তাদেরকে নাকি ভয়-ভীতি দেখিয়ে এক দফার বিষয়ে রাজি করানো হচ্ছে। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নাহিদ ভাই জানিয়েছেন, যদি তাদেরকে বেশি প্রেসারাইজ করা হয়, তাহলে তারা এক দফা দিতে পারে। মূলত সেই প্রেক্ষতেই রিফাতদের সেই সময়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়।’
সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ নিয়ে কাদের লিখেন, ‘এইভাবে যোগাযোগের চেষ্টা চলতে থাকে, সময় গড়াতে থাকে। আরও পরে রিফাতরা ফোন ধরে জানায়, আমরা এখন একদফা দিব না। নাহিদ ভাই এনশিউর করছে, একদফা মাঠ থেকেই দিবে। আবারও আলাপ চলতে থাকে। একটা পর্যায়ে, রিফাতদের থেকে আমি কনফার্ম হতে চাই, নাহিদ-আসিফ ভাইরা আগামীকাল এক দফা দিবে কি না। তারা কনফার্ম হয়ে পরবর্তীতে আমাকে জানায় যে, আগামীকাল নাহিদ ভাইরা এক দফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর যদি না দেয় তাহলে আমরা চারজন মিলেই এক দফা দিব। সিনিয়রদের জন্য আর ওয়েট করব না। রিফাত আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দেয়। এই প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে ওইদিন এক দফার ঘোষণা আর দেই নাই, প্রস্তুতকৃত ভিডিও বার্তাও পাবলিক করি নাই। আমি তাদের কথায় কনভিন্সড হয়ে যাই। কারণ, এক দফা আমি কিংবা আমরা রিফাতরা-ই দিতে হবে, বিষয়টা তেমন না। আমাদের এক দফায় আসতে হবে, এক দফা দিতে হবে, সেটাই আমার মূল কনসার্ন ছিল। চারদিকে এতো এতো হত্যাযজ্ঞ আর পরদিন হাসিনার নয় দফা মেনে নেওয়ার নামে নতুন দুরভিসন্ধির ব্যাপারেই মূলত কনসার্ন ছিলাম।’
গণ-অভ্যুত্থানের মোড় পাল্টে দেওয়া এই এক দফা ঘোষণা নিয়ে কাদের বললেন, ‘যাইহোক, এক দফার নেপথ্যে এই হলো আমার দেখা ঘটনাপ্রবাহ। যদি আমার ভূমিকা বলেন, সেক্ষেত্রে আমি কেবল চেষ্টা করছি, এক দফার ঘোষণা আসা নিয়ে, কারণ এটাই মোক্ষম সময়। শুক্রবার দুপুরের অনলাইন মিটিং এ এক দফা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। সেটা আমি ওই মিটিয়েও জানিয়েছি এবং আমার চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে পরবর্তীতে এক দফাকে এগিয়ে আনার জন্য কাজ করছি, যেটা তারা সাত-দশদিন পরে দেওয়ার কথা ভাবছিল, সেটা আমি পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই-একের মধ্যে করতে চাইছি, এতোটুকুই। আর এক দফা নিয়ে রিফাত-মাসুদদের ভয়ভীতি দেখানো কিংবা জোরপূর্বক রাজি করানোর ব্যাপারটা মোটেও সত্য না। কিংবা নাহিদ-মাহফুজ ভাইরা আন্দোলন পরবর্তীতে যে ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে যে, সমন্বয়কদের রাতের বেলায় একটা নির্দিষ্ট কোয়াটার থেকে এক দফার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বা নাহিদ ভাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এটা ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার একটা ফাঁদ ছিল, সেই ন্যারেটিভও আমার কাছে সত্য বলে মনে হয় না।
কারণ, রিফাতরা পরবর্তীতে জানাইছে, তারা গুলির মুখে জিম্মি কিংবা তাদেরকে জোরপূর্বক রাজি করানো হচ্ছে, বিষয়টা তারা এইভাবে নাহিদ ভাইদেরকে জানায় নাই। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতে তারা ভড়কে গেছে, সার্বিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা যে উদ্বিগ্ন হইছে এটা সত্য। সেজন্যই তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছিল না। তাদের জায়গা থেকে তখন ওই পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো কঠিনও ছিল। আমার আশপাশে তো মানুষ ছিল, সংশয়-সংকোচ থাকলে আলাপ করে সিদ্ধান্তে আসতে পারছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, অভয় পাইছি। সে হিসেবে আমি যেমন কনফিডেন্ট ছিলাম, তারা তেমনটা হতে পারে নাই। তাদের ক্ষেত্রে হয়তো সেই পরিবেশ ছিল না। বাসায় তিনজন একা ছিল। আর যাদেরকে মাহফুজ ভাই কোয়াটার বলতেছে কিংবা নাহিদ ভাই ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখা ফাঁদের অংশ বলতেছে, সেই তারাই কিন্তু বাইশ-তেইশ তারিখ থেকে আমাদের চারজনকে নিরাপত্তা দিয়েছিল, সার্বিক দায়িত্ব পালন করেছিল। আমাদেরকে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তারাও নিজেদের মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েছিল।’
আন্দোলন চলাকালীন সমন্বয়কদের নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে কাদের বললেন, ‘আমি যদি স্পেসিফিকলি বলি, ওইদিন এক দফার আলাপে জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের এক নারী সাংবাদিক, অন্য ব্যক্তি ওয়াহিদ আলম; যিনি কাফরুল থানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে সেই সময়ে আমি জেনেছি। এখন অবশ্য তিনি এনসিপির মহানগরীর দায়িত্বে আছেন আর ছিলেন তায়সীর কাদের চৌধুরী; যার বাসায় আমি ছিলাম; উনি ছাত্র অবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জেনেছি এবং ঢাকায় একটা দূতাবাসে জব করেন। আমরা এই তিনজন নিজেদের মধ্যে এক দফা নিয়ে শুরুতে আলাপ অরি। এই আলাপে পরবর্তীতে অনলাইনে যুক্ত হন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ভাই, তারও অনেক পরে ফোন কলে এই বিষয়ে আমাদের আলাপ হয় মানবাধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন ভাইয়ের সঙ্গে। মোটামুটি এই কয়জন মূলত ওইদিন পুরা প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলেন। এক দফা ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে আলাপ উত্থাপিত হলে ওয়াহিদ ভাই সায়ের ভাইকে ফোন দেন, সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য। সায়ের ভাই জানায়, ‘আমি আপনাদের থেকে অনেক দূরে আছি, আপনারা মাঠ পর্যায়ে আছেন, মাঠের পরিস্থিতি আপনারা ভালো বুঝবেন। পরিস্থিতি বুঝে আপনারা সিদ্ধান্ত নেন। আমাকে জানান। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে।’ সায়ের ভাই পরবর্তী পক্রিয়ায় বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে কানেক্টেড ছিলেন। তাইসির ভাই আবার তার পূর্বপরিচিত বিএনপি নেতা মীর হেলালের সঙ্গেও ওই সময় পরামর্শ করেছিলেন।’
পরবর্তীতে উঠা বিতর্ক নিযে কাদের বললেন, ‘ওইদিন এইভাবে একদফার আলাপটা উত্থাপিত হওয়ার পরে আমরা নানান দিক থেকে খোঁজ খবর নিয়ে, উপস্থিত নিজেরা আলাপ করে এক দফার বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হই। তারপর রিফাতদেরকে জানাই। এখানে উপস্থিত একেকজন একেক ঘরনার ছিলেন। নিজেদের মধ্যে অনেক তর্কবিতর্ক হইছে এক দফা ঘোষণার বিষয়ে। এটা সাধারণ একটা বাসা ছিল। অন্যদিনের মতো কর্মসূচি ঠিক করার গতানুগতিক প্রক্রিয়া ছিল। কথিত কোয়ার্টার কিংবা ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার ফাঁদ কীভাবে ছিল, সেটা আমার জানা নাই। তাছাড়া ওইদিনের ঘোষণায় ছাত্রদের সমন্বয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হইছিল। ছাত্রদল এবং শিবিরের নেতৃবৃন্দ তাদের মাদার পার্টির সঙ্গে আলোচনা করে ওইদিন এক দফার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। যেটা নিত্য প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ছিল। সবাই অবগত, সবাই রাজি এবং প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাহলে এটা কীভাবে কোয়াটার থেকে আসে বা ফ্যাসিবাদের অংশ, আমার বোধগম্য না।’
কাদের লিখেন, ‘আর রিফাতদেরকে ভয় ভীতি দেখানোর বিষয়টা ছিল এই- তারা যখন সপরিবারে নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিতের একপর্যায়ে এক দফা নিয়ে রাজি হয়ে পরবর্তীতে আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেছিল। ফোন ধরতেছিল না, সিদ্ধান্ত জানাইতেছিল না, তখন ডেইলি স্টারের সেই নারী সাংবাদিক বিরক্তির স্বরে কিংবা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বলেছিল, ‘তোমাদের বিষয়ে আমরা আর মাথাঘামাব না। কাল থেকে তোমরা কই থাকবা না থাকবা, আমরা আর জানি না।’ ওয়াহিদ ভাই খুবই স্পষ্ট করে তাদের বারবার বলেছিল, ‘এক দফার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া না নেওয়া একান্তই তোমাদের ব্যাপার। আমরা কেবল পরামর্শ দিতে পারি এবং সহযোগিতা করতে পারি।’
তার দাবি, ‘এক্ষেত্রে যদি ভয়ভীতি কিংবা জোর করা হয়, তাহলে ওই নারী সাংবাদিকের ওই বক্তব্যটুকুই। এর বাহিরে রিফাতদেরকে ভয়ভীতি দেখানোর মতো কিছু করছে কিংবা বলছে কিনা, আমার চোখে পড়ে নাই এবং ওই সময়ে আলাপচারিতার একটা অংশ আমার কাছে রেকর্ডও আছে।’




