গেস্টরুম নির্যাতনকারী ছাত্রলীগ নেতা এখন ‘শিবির অ্যাক্টিভিস্ট’!

অভিযুক্ত আরিফুজ্জামান সৌরভ । ছবি: ফেসবুক থেকে
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রচলন ছিল ভয়াবহ গেস্টরুম প্রথার। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পর একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে এই চর্চা। তবে এখনো আলোচনায় তৎকালীন গেস্টরুমের নামে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করা বিভিন্ন ছাত্রলীগ নেতারা। ভুক্তভোগী অনেকেই প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেন এসব নির্যাতিত ইতিহাস।
কাকতালীয়ভাবে অধিকাংশ অভিযোগ এমন সব শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যায় যারা বর্তমানে ছাত্র শিবিরের হয়ে ‘অ্যাক্টিভিজমে’ লিপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতেও আলোচনা হয় এসব নিয়ে। ডাকসু এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগেও গেস্টরুম, গণরুমের ভয়াবহ ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার প্রচেষ্টা দেখা গেছে। তবে সম্প্রতি মো. আরিফ ইসতিয়াক রাহুল নামক এক ছাত্রলীগ নেতার পোস্টের পর আবারও শুরু হয় আলোচনা। পদধারী সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে গেস্টরুমে নির্যাতনের। যাকে জুলাই আন্দোলনের পর দেখা গেছে প্রায় নিয়মিত ছাত্র শিবিরের পক্ষে ব্যক্তিগত ফেসবুকে প্রচারণা চালাতে।
অভিযুক্ত মো. আরিফুজ্জামান সৌরভ আরবি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশন শিক্ষার্থী। তিনি ছিলেন স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। অভিযোগকারী আরিফ ইসতিয়াকও (২০২০-২১ সেশন) ছিলেন একই কমিটিতে ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল ইমিডিয়েট সিনিয়র-জুনিয়র।
আরিফ ইসতিয়াক নামে ফেসবুক আইডিতে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া গেস্টরুম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘হলে ওঠার কয়েকদিনের মধ্যেই একদিন দুপুরে সৌরভ ভাই আমাকে ফোন করে দুইটা সিগারেট কিনে উনার রুমে নিয়ে যেতে বলে। গেস্টরুমের সুবাদে ততদিনে আমরা জেনে গেছি, ইমিডিয়েট সিনিয়রা ইমিডিয়েট জুনিয়রদের দিয়ে সিগারেট আনায়। এটা হলের অলিখিত নিয়ম।’
তবে অলিখিত আরও একটি নিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারী। অধূমপায়ী কাউকে দিয়ে আনানো যাবে না সিগারেট। বিষয়টি গেস্টরুম থেকেই আলাদা করা হতো জুনিয়রদের মধ্যে কারা ধূমপান করেন আর কারা করেন না।
আরিফ ইসতিয়াকের অভিযোগ, অধূমপায়ী হওয়ায় তাকে দিয়ে কেউ কখনো কেউ সিগারেট আনায়নি। কিন্তু অভিযুক্ত সৌরভ তাকে দিয়ে কাজটি করিয়েছে। তার ভাষ্য, ঘটনার পর খুব অপমানিত বোধ করেন। কিন্তু সিনিয়রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেননি হল থেকে বের করে দেওয়ার ভয়ে। সেইসঙ্গে ‘শিবির তকমা’ পাওয়ার আশঙ্কাও ছিল তার।
অভিযোগকারীর সঙ্গে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছেন অভিযুক্ত সৌরভ। গভীর রাতেও ফোন করে সিগারেট আনতে বলা হতো বলে দাবি করা হয় পোস্টে।
ইমিডিয়েট সিনিয়রের বাইরে অন্য সিনিয়রদের সঙ্গে প্রথমবর্ষের জুনিয়রদের যোগাযোগ রাখার ব্যাপারেও গেস্টরুমে ছিল কড়া নজরদারি। চোখে পড়লে বা কোনো অভিযোগ পেলে গেস্টরুমে চালানো হতো নির্যাতন। বিশেষ করে কোনো জুনিয়র ‘চেইন অব কমান্ড’ অমান্য করে সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নেওয়া হতো ‘সিঙ্গেল গেস্টরুম’। যার ভয়াবহতা ছিল অনেক বেশি।
একই ঘটনার শিকার আরিফ ইসতিয়াক। হল গেটে দাঁড়িয়ে নিজ বিভাগের কয়েক ব্যাচ সিনিয়র ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে তাকে গেস্টরুমে ডাকা হয় বলে অভিযোগ। পোস্টে অভিযোগকারী লিখেছেন, ‘গেস্টরুমের নাম-পরিচিতি পর্ব শেষ হওয়ার পরই সৌরভ ভাই আমাকে দাঁড়াতে বললেন, আমি দাঁড়ালাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, বল, তোর ফল্ট কি? কেনো তোকে দাঁড়াতে বললাম?’
‘গেস্টরুমের নিয়ম হচ্ছে সিনিয়রদের কোনো কথার উত্তর দেওয়া যাবে না। ভালো-মন্দ যেটাই বলুক শুনতে হবে চুপ করে। উনি এবং উনার সঙ্গে রুদ্র ভাই ধমকাচ্ছিল। আমি চুপ করে শুনছিলাম। হঠাৎ সৌরভ ভাই উঠে এসে জোর দিয়ে আমার বুকে একটা ধাক্কা মারল। আমি উল্টো হয়ে পেছন দিকে দরজার ওপরে পড়ে গেলাম। ব্যথাও পেলাম। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ায় উনার বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। এই কাজ উনি প্রায়ই করতো। আমি পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে উনি চিৎকার করে বললে, (গালি) পোলা, ফল্ট খুঁজে পাস না? একটু আগে হল গেটে তোর বাপের সাথে লবিং (গালি)?’
ঘটনার পর মানসিকভাবে অনেকটাই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন বলে জানান আরিফ ইসতিয়াক।
অভিযোগকারী ২০২২ সালের শেষের আরও একটি নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সেসময় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল আসার খবরে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য ডাকা হয় গেস্টরুম। এর নেতৃত্বে ছিলেন সৌরভ। সেদিনের গেস্টরুমের বিষয়বস্তু ছিল ছাত্রদল ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া। পরিকল্পনা ছিল সহিংসতারও। তাই জুনিয়রদেরকে বলা হয়েছিল ৩০-৪০টি ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প সংগ্রহ করতে। গণরুমের উঠার পরই জুনিয়রদের এই ধরনের বস্তু সংগ্রহে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন আরিফ ইসতিয়াক।
স্ট্যাম্প কেনার দায়িত্ব অবহেলা করায় অভিযোগকারীর এক বন্ধুকেও নির্যাতন সহ্য করা হয়েছিল বলে দাবি। ঘটনার দিন মধ্যরাতে গেস্টরুম ডেকে যখন স্ট্যাম্প দিতে বলা হয় তখন জুনিয়রদের কাছে সেগুলো ছিল না। আর মাঝরাত হওয়ায় ছিল না কোনো দোকান থেকে কেনার মতো পরিস্থিতি, লিখেছেন আরিফ ইসতিয়াক।
‘আর তখন অলরেডি মাঝরাত, দোকানে গিয়ে কেনাও সম্ভব নয়। আমরা যখন জানালাম, স্ট্যাম্প আমরা উনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু উনারা ফেরত দেয়নি, তখন তা অস্বীকার করল। আমাদের বললো, স্ট্যাম্প আছে। সবাই মিলে ভালো করে খোঁজ। আধা ঘণ্টা পর আবার তোদের সঙ্গে বসব। আবার বসা মানে আবার গেস্টরুম।’
আরিফ ইসতিয়াকের পোস্ট অনুযায়ী, ‘এই আধা ঘণ্টা সময়ের মাঝখানে সৌরভ ভাই কি যেনো বলতে আমাদের রুমের সামনে আসলো। উনার একটা ভালো দিক হলো গেস্টরুমে পশুর মতো আচরণ করলেও গেস্টরুমের বাইরে উনি স্বাভাবিক ও সামাজিকভাবেই কথা বলতো। এই সময় আমি উনাকে বললাম, ভাই, স্ট্যাম্প আসলেই আমাদের কাছে নেই। আমরা আপনাদের দিয়েছিলাম।’
এ কথার পর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে সৌরভ বলেছিল, ‘স্ট্যাম্প তোদের দিতেই হবে। কই থেকে দিবি সেটা তোদের বিষয়। স্ট্যাম্প যদি না পাস তাহলে মল চত্বরে গিয়ে স্ট্যাম্পের সাইজে গাছের ডাল কেটে আন তোরা।’
আরিফ ইসতিয়াকের ভাষ্য, এ কথার পর জবাবে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। ততদিনে হল ছাত্রলীগের কমিটি হয়ে গেছে। আর দুজনেই তখন পদধারী নেতা। তাই পদের দিক দিয়ে দুজনেই ছিলেন সমান।
সেদিন গেস্টরুম শেষের দিকে সৌরভ আরিফ ইসতিয়াকের কলার ধরেছিল বলে পোস্টে দাবি করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীকে গালাগাল ও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় বলে দাবি।
জুলাইয়ের পর আরিফ ইসতিয়াক হলে অবস্থান করছেন না। তবে সৌরভ এখনো থাকেন হলে। তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে দেখা যায় জামায়াত শিবিরপন্থী পোস্ট ও কমেন্ট।


