আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
প্রবীণদের প্রতি ইসলামের দায়িত্ববোধ

প্রতীকী ছবি
প্রতিবছর ১ অক্টোবর বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রবীণ মানুষের অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আনাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। কিন্তু শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কি প্রবীণদের অধিকার আদায় হয়? জীবনের যে মানুষটি একদিন আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, বয়সের ভারে যখন তার হাত কাঁপতে শুরু করেছে। তখন কি আমরা তার হাতটি ধরে রাখতে পারছি?
বার্ধক্য মানুষের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। শৈশবের পর যৌবন আসে, যৌবনের পর বার্ধক্য। মানুষ একসময় কর্মক্ষমতা হারায়, শারীরিক শক্তি কমে আসে, চলাফেরায় অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আধুনিক নগরজীবন, একক পরিবার, কর্মব্যস্ততা এবং প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব অনেক প্রবীণকে শারীরিকভাবে পরিবারের মধ্যে থেকেও মানসিকভাবে একা করে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় ইসলামের শিক্ষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসলাম প্রবীণদের প্রতি দয়া দেখানোর আহ্বান করার পাশাপাশি তাদের মর্যাদা রক্ষা ও সেবাকে পারিবারিক দায়িত্বের অংশও ঘোষণা করেছে।
পবিত্র কোরআনে বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে—
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
এ আয়াতের দিকে গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, ইসলামে প্রবীণদের যত্ন শুধু তাদের শারীরিক প্রয়োজন পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অনুভূতি ও আত্মমর্যাদার প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিরক্তি প্রকাশের সামান্যতম শব্দ ‘উফ’ বলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধ বাবা-মা একই কথা বারবার বললে, চলাফেরায় ধীর হলে, কোনো বিষয়ে শিশুসুলভ আচরণ করলে কিংবা তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে সন্তানকে বাড়তি শ্রম দিতে হলেও তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না।
এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও গভীর একটি দিক তুলে ধরেছেন—
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
‘তাদের প্রতি দয়াবশত নম্রতার ডানা অবনত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৪)
এখানে পবিত্র কোরআন সন্তানকে তার নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। যে সন্তান একসময় নিজের প্রয়োজন নিজে বুঝত না, হাঁটতে পারত না, খেতে পারত না, এমনকি সন্তান অসুস্থ হলে রাত জেগে যার মা-বাবা তার পাশে থাকতেন। বয়সের ভারে সেই মা-বাবা যখন নিজের কাজ নিজে করতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনে বিরক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলাম শুধু কোরআনের মাধ্যমে নয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের মাধ্যমেও প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا
‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের মর্যাদা জানে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)
এই হাদিসটি প্রবীণদের প্রতি ইসলামের সামাজিক দর্শনকে স্পষ্ট করে। সমাজে শিশু যেমন ভালোবাসা ও সুরক্ষার অধিকারী, প্রবীণও তেমনি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। বয়সের কারণে কারও সামাজিক মূল্য কমে যায় না। বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, ধৈর্য ও বাস্তববোধ পরিবার ও সমাজের জন্য সম্পদ হতে পারে।
বাবা-মায়ের সেবার গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ " . قِيلَ مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ " .
‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কে?’ তিনি বললেন, ‘যে তার বাবা-মায়ের একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
হাদিসটিতে বাবা-মায়ের বার্ধক্যকে ইসলাম সন্তানের জন্য শুধু দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে জান্নাত অর্জনের বিরাট সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাদের সেবা, প্রয়োজন পূরণ, সঙ্গ দেওয়া, সম্মানের সঙ্গে কথা বলা এবং কষ্টের সময়ে পাশে থাকা একজন মুসলিমের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
তবে প্রবীণদের অধিকার শুধু নিজের বাবা-মায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম একটি এমন সমাজের শিক্ষা দেয়, যেখানে বয়সের কারণে মানুষ অবহেলিত হবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত হলো বয়স্ক মুসলিমকে সম্মান করা।’ (আবু দাউ;, হাদিস : ৪৮৪৩)
এই শিক্ষা পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রবীণের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জনসমক্ষে তাকে সম্মান দেওয়া, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা, তার দুর্বলতাকে উপহাস না করা এবং তার অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া ইসলামী সামাজিকতার অংশ।
আজকের বিশ্বে প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো একাকিত্ব। একই বাড়িতে থেকেও সন্তানদের ব্যস্ততা, প্রজন্মগত দূরত্ব কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের কারণে একজন বৃদ্ধ মানুষ দিনের পর দিন কথা বলার মানুষ না-ও পেতে পারেন। অথচ প্রবীণের প্রয়োজন শুধু খাবার, পোশাক ও ওষুধ নয়; তার প্রয়োজন একজন শ্রোতা, একজন সঙ্গী, কিছু আন্তরিক কথা এবং নিজের অস্তিত্বের মূল্য অনুভব করা।
এখানেই ইসলামের পারিবারিক কাঠামোর সৌন্দর্য। ইসলাম পরিবারকে শুধু একই ছাদের নিচে বসবাসের ব্যবস্থা হিসেবে দেখেনি; বরং পারস্পরিক দায়িত্ব ও মমতার বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের দোয়া করতে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলতে বলা হয়েছে এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবীণকে পরিবারের ‘বোঝা’ মনে করার মানসিকতা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অবশ্য বাস্তবতার কিছু জটিলতাও রয়েছে। কখনো প্রবীণের বিশেষ চিকিৎসা, পরিচর্যা বা নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজন হতে পারে। কোনো পরিবার যদি একা তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে উপযুক্ত প্রবীণসেবা, চিকিৎসাকেন্দ্র বা পরিচর্যা ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যেকোনো ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকতে হবে মানবিক মর্যাদা ও পারিবারিক দায়িত্ব। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত না হয় এবং কোনো প্রবীণ যেন নিজেকে পরিত্যক্ত মনে না করেন।
বিশ্ব প্রবীণ দিবস তাই কেবল প্রবীণদের জন্য শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের জন্যও আত্মজিজ্ঞাসার দিন। আমরা আজ যে বাবা-মায়ের হাতে হাত রেখে বড় হয়েছি, কাল হয়তো তারাই আমাদের হাত ধরে হাঁটতে চাইবেন। আজ যাদের কথা ধীর মনে হয়, একদিন হয়তো আমাদের কথাও তেমনি ধীর হবে। আজ যাদের চলাফেরা আমাদের কাছে সময়সাপেক্ষ মনে হয়, একদিন হয়তো আমাদেরও কারও হাত ধরে চলতে হবে।
তাই প্রবীণদের জন্য মানবিক সমাজ গড়ে তোলার আবেদন শুধু আন্তর্জাতিক কোনো দিবসের বিষয় নয়; এটি আমাদের পারিবারিক চরিত্র, সামাজিক নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সমন্বিত দায়িত্ব।
ইসলাম বহু শতাব্দী আগে যে শিক্ষা দিয়েছে, তার মর্ম আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান করতে জানে, সে সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই সম্মান করে। আর যে পরিবার বার্ধক্যে তার মা-বাবাকে একা হতে দেয় না, তারা শুধু অতীতের ঋণ শোধ করে না, আগামী দিনের জন্যও ভালোবাসার একটি নিরাপদ পৃথিবী নির্মাণ করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



