স্বামী, পিতা ও পরিবারের মানুষ হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)

সংগৃহীত ছবি
একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা তার ঘর। বাইরে মানুষের সঙ্গে সৌজন্য দেখানো সহজ, কিন্তু পরিবারের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভেতরেই তার ধৈর্য, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আল্লাহর রাসুল, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক ও সেনাপতি। কিন্তু ঘরের দরজা পেরিয়ে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী, মমতাময় পিতা এবং পরিবারের কাজে সহযোগিতাকারী এক অসাধারণ মানুষ। তাই তাঁর পারিবারিক জীবন আজকের পরিবারগুলোর জন্যও একটি বাস্তব আদর্শ।
মহানবী (সা.) নিজেই পারিবারিক উত্তম আচরণকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। যাতে প্রমাাণিত হয় যে, সমাজে মানুষের সম্মান, পদ বা জনপ্রিয়তার চেয়ে নিজ পরিবারের সঙ্গে আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারের মানুষই একজন ব্যক্তির প্রকৃত স্বভাব সবচেয়ে কাছ থেকে দেখে।
স্বামী হিসেবে নবীজি (সা.)-এর জীবন ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও কোমলতায় পরিপূর্ণ। তিনি স্ত্রীদের অনুভূতি ও পছন্দকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এক সফরে আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতাও করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা (রা.) নবীজিকে পেছনে ফেলেছিলেন; পরে আরেকবার তিনি তাকে পেছনে ফেলে মৃদু হাস্যরস করে বলেছিলেন, ‘এটি সেই প্রতিযোগিতার জবাব।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আনন্দ, হাসি ও বন্ধুত্বেরও যে জায়গা আছে, এই ঘটনাটি তার সুন্দর দৃষ্টান্ত।
স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের ধরনও ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি তাঁর ব্যবহৃত পাত্রের একই স্থান থেকে পান করতেন এবং তিনি যে স্থানে মুখ রেখেছেন, সেখানেই মুখ রাখতেন (মুসলিম, হাদিস : ৩০০)। আজকের দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় ভালোবাসা অনুভব করা হলেও তা প্রকাশ করা হয় না। নবীজি (সা.)-এর জীবন শেখায়, ভালোবাসা শুধু অন্তরে রাখার বিষয় নয়; সুন্দর আচরণ ও ছোট ছোট যত্নের মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ করা উচিত।
তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে কখনো রূঢ় বা নির্যাতনমূলক আচরণ করতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের হাতে কখনো কোনো নারী বা খাদেমকে প্রহার করেননি।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩২৮)। পারিবারিক সহিংসতার এই সময়ে এ শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মতভেদ হতে পারে, রাগ হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্ককে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনে পরিণত করা নবীজির (সা.) আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাঁর পারিবারিক জীবনের আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল ঘরের কাজে সহযোগিতা করা। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবীজি (সা.) ঘরে কী করতেন। তিনি বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন; নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)। যিনি ছিলেন সমগ্র উম্মাহর নেতা, তিনিই ঘরে পরিবারের কাজে হাত লাগাতেন। এতে বোঝা যায়, পরিবারের কাজে সহযোগিতা মর্যাদা কমায় না; বরং দায়িত্বশীলতা ও ভালোবাসার পরিচয় বহন করে।
পিতা হিসেবে নবীজি (সা.)-এর হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। সন্তানদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তিনি গোপন রাখতেন না। তিনি তাদের চুমু দিতেন, কোলে নিতেন এবং স্নেহ করতেন। একবার তিনি তাঁর নাতি হাসান (রা.)-কে চুমু দিলেন। আকরা ইবন হাবিস (রা.) বললেন, তার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি কখনো তাদের কাউকে চুমু দেননি। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)। সন্তানকে শুধু শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বড় করা নয়, তাকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়াও পিতার দায়িত্ব।
শিশুদের প্রতি তাঁর কোমলতা শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করতেন। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের পাশ দিয়ে গেলে তাদের সালাম দিতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬২৪৭; মুসলিম, হাদিস : ২১৬৮)। শিশুদের ছোট মনে করে অবহেলা না করে তাদের সম্মান দেওয়া মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর একটি সুন্দর দিক।
পরিবারের সদস্যদের অনুভূতির প্রতিও নবীজি (সা.) ছিলেন সংবেদনশীল। আয়েশা (রা.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা সম্পর্কে সাহাবিরা জানতেন। একবার আমর ইবনুল আস (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে? তিনি বলেছিলেন, ‘আয়েশা’। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষদের মধ্যে? তিনি বললেন, ‘তার পিতা’। (বুখারি, হাদিস : ৩৬৬২; মুসলিম, হাদিস : ২৩৮৪)। নিজের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে তিনি সংকোচ করেননি। এতে দাম্পত্য সম্পর্কে সম্মান ও প্রকাশ্য ভালোবাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
তবে নবীজির (সা.) পারিবারিক জীবন শুধু হাসি-আনন্দের ছিল না; সেখানে দুঃখ ও বিচ্ছেদের গভীরতাও ছিল। তাঁর একাধিক সন্তান নিজ জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেছেন। পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর সময় তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়; তবে আমরা এমন কথাই বলব, যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩০৩; মুসলিম, হাদিস : ২৩১৫)। এতে একদিকে পিতার স্বাভাবিক ভালোবাসা ও শোক প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে বিপদের সময় আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের অসাধারণ শিক্ষা রয়েছে।
পরিবারের মানুষ হিসেবে নবীজি (সা.) ছিলেন বিনয়ী ও সহজ-সরল। তিনি ঘরের কাজ করতেন, নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজেই করতেন এবং পরিবারের ওপর নিজের মর্যাদার বোঝা চাপিয়ে দিতেন না। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, পরিবারে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে বড় বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সময়, মনোযোগ, সহযোগিতা, কোমল ভাষা ও সম্মান।
আজকের পরিবারে অনেক সংকটের মূলেই রয়েছে যোগাযোগের অভাব, অহংকার, রাগ, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশে অনীহা। একজন স্বামী হয়তো সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত, কিন্তু ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে রূঢ়; একজন পিতা হয়তো সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অর্থ ব্যয় করেন, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় পান না। মহানবী (সা.)-এর জীবন এসব ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। পরিবারকে শুধু ভরণপোষণের জায়গা নয়, বরং ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক প্রশান্তির আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মহানবী (সা.) বাইরে যেমন ছিলেন ন্যায়পরায়ণ নেতা, ঘরে তেমনি ছিলেন কোমল স্বামী; বাইরে যেমন ছিলেন উম্মাহর শিক্ষক, সন্তানদের কাছে তেমনি ছিলেন স্নেহময় পিতা; আর নাতিদের কাছে ছিলেন ভালোবাসায় ভরা আস্থার ঠিকানা। তাঁর পারিবারিক জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিরাতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মঞ্চে নয়, ঘরে; মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় জনসমক্ষে নয়, পরিবারের কাছে। যে মানুষ ঘরে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ব ও দয়া প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে-ই নবীজি (সা.)-এর পারিবারিক আদর্শের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






