সিরাতুর রাসুল (সা.)
নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ কী?

সংগৃহীত ছবি
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিগুলোর একটি। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার কথা মনে রাখে, তার পছন্দকে গুরুত্ব দেয় এবং তার পথ অনুসরণ করতে চায়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি একজন মুমিনের ঈমানেরই অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।’ (বুখারি, হাদিস: ১৫; মুসলিম, হাদিস: ৪৪)
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ কী?
নবীপ্রেম মানে শুধু তাঁর নাম শুনে আবেগাপ্লুত হওয়া নয়, শুধু দরুদ পড়া নয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করাও নয়। এসব ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অনুসরণ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভালোবাসার দাবি তখনই সত্য হবে, যখন তাঁর সুন্নাহ আমাদের জীবনের পথনির্দেশ হয়ে উঠবে। তিনি সত্যবাদী ছিলেন, তাই তাঁর অনুসারীর কথায় সত্য থাকতে হবে। তিনি আমানতদার ছিলেন, তাই আমাদের লেনদেনে আমানতদারি থাকতে হবে। তিনি মানুষের প্রতি দয়ালু ছিলেন, তাই তাঁর উম্মতের আচরণেও দয়া ও সহমর্মিতা প্রকাশ পাওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ ঘোষণা করেছেন: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তার জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।” (সুরা আহযাব, আয়াত: ২১)
তাই রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা জীবনের কোনো একটি অংশে সীমাবদ্ধ নয়। নামাজ, রোজা ও ইবাদতের পাশাপাশি পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক, ক্ষমা, ধৈর্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের প্রতি মমতা, সব ক্ষেত্রেই তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে।
সাহাবিদের নবীপ্রেম ছিল এমনই বাস্তব। হজরত উমর (রা.) একবার বলেছিলেন, রাসুল (সা.) তাঁর নিজের প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। তখন নবীজি (সা.) তাকে জানালেন, নিজের প্রাণের চেয়েও তাঁকে বেশি ভালোবাসতে হবে। উমর (রা.) বললেন, “এখন আপনি আমার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়।” রাসুল (সা.) বললেন, “এখন, হে উমর।” (বুখারি, হাদিস: ৬৬৩২)
এই ভালোবাসা তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছিল। তাঁরা নবীজির কথা শুনতেন, তাঁর নির্দেশ মানতেন এবং তাঁর চরিত্র নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করতেন।
তাই আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার: আমরা কি শুধু নবীজিকে ভালোবাসি বলি, নাকি তাঁর ভালোবাসা আমাদের চরিত্রও বদলে দিচ্ছে? তাঁর সুন্নাহ কি আমাদের পরিবারে, লেনদেনে, কথাবার্তায় ও মানুষের সঙ্গে আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে?
নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ এখানেই। তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠানো, তাঁর জীবন জানা এবং তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনের পথ বানানো। কারণ মুখের ভালোবাসা যত সুন্দরই হোক, অনুসরণ ছাড়া তা পূর্ণতা পায় না।
আল্লাহ আমাদের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






