আখেরি চাহার সোম্বা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইসলামের শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
সফর মাসের শেষ বুধবারটি উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামে পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে এই দিনকে ঘিরে কোনো কোনো মুসলিম সমাজে নানা স্মৃতি, রীতি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কোথাও মানুষ নফল ইবাদত করেন, কোথাও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হন, কোথাও আবার নবীজি (সা.)-এর অসুস্থতা ও শেষ জীবনের স্মৃতি স্মরণ করেন। ফলে দিনটি শুধু একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, মুসলিম সংস্কৃতি ও লোকাচারেরও একটি পরিচিত অংশ।
তবে আখেরি চাহার সোম্বা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে ইতিহাস, প্রচলিত ঐতিহ্য এবং শরিয়তের বিধানকে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন। কারণ কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ এবং সেটিকে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ কী?
ফারসি ‘চাহার সোম্বা’ অর্থ বুধবার। ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ অর্থ শেষ বুধবার। মুসলিম সমাজে এটি সাধারণত সফর মাসের শেষ বুধবার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ দিনকে ঘিরে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি গড়ে উঠেছে। এসব রীতির ধরনও সর্বত্র এক নয়। এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রীতিতে পালন করা হয় নানান কর্মকান্ড।
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামটি কোরআন বা সহিহ হাদিসের পরিভাষা নয়। এটি মূলত মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক নাম।
নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা
আখেরি চাহার সোম্বার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচিত হয়, তা হলো মহানবী (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা।
সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার সময় তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থান করেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) অসুস্থ অবস্থায় তাঁর ওপর ভর দিয়ে মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। পরে অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি আবু বকর (রা.)-কে মানুষের নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দেন। (বুখারি, হাদিস: ৬৮৭)
শেষ অসুস্থতার এক পর্যায়ে নবীজি (সা.)-এর শারীরিক অবস্থায় কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। বুখারির একটি বর্ণনায় এসেছে, সোমবার সকালে আবু বকর (রা.) ইমামতি করছিলেন। তখন নবীজি (সা.) আয়েশা (রা.)-এর ঘরের পর্দা উঠিয়ে সাহাবিদের নামাজরত অবস্থায় দেখেন এবং তাঁদের দেখে হাসেন। সাহাবিরা আনন্দিত হয়ে প্রায় নামাজ ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) ইশারায় তাঁদের নামাজ পূর্ণ করতে বলেন। এরপর তিনি পর্দা নামিয়ে দেন। (বুখারি, হাদিস: ৬৮০)
এই ঘটনাটি মহানবী (সা.)-এর জীবনের শেষ দিনের অন্যতম মর্মস্পর্শী ঘটনা। তবে এটিকে সফর মাসের শেষ বুধবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না।
শেষ বুধবারে সুস্থতা লাভের কথা কতটা প্রমাণিত?
আখেরি চাহার সোম্বা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার একটি হলো, সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী (সা.) তাঁর অসুস্থতা থেকে সাময়িকভাবে সুস্থতা লাভ করেছিলেন। এ কারণে অনেকে দিনটিকে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার দিন হিসেবে স্মরণ করেন।
ঐতিহাসিক ও সীরাতের কিছু গ্রন্থে নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার বিভিন্ন পর্যায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি বিশেষভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই কারণে পরবর্তী সময়ে এ দিনকে বিশেষভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন, এমন কোনো সুস্পষ্ট সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। নবীজি (সা.)-এর অসুস্থতার সময় সাময়িকভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল, এ বিষয়টি সহিহ বর্ণনায় রয়েছে। কিন্তু সেই উন্নতিকে ‘সফরের শেষ বুধবারের বিশেষ ঘটনা’ হিসেবে নির্দিষ্ট করা এবং এ দিনকে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ মর্যাদার দিন হিসেবে নির্ধারণ করা ভিন্ন বিষয়।
বিশেষ ইবাদতের ব্যাপারে সতর্কতা
আখেরি চাহার সোম্বাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন ধরনের আমল প্রচলিত রয়েছে। কেউ নফল নামাজ পড়েন, কেউ রোজা রাখেন, কেউ দোয়া করেন, কেউ দান-সদকা করেন। এসব আমল অন্য সকল দিনের মতো করে নফল ইবাদত মনে করলে কোনো আপত্তির কারণ নেই।
কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ ফজিলত বা বিশেষ ধর্মীয় বিধান নির্ধারণ করতে হলে তার জন্য কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসের দলিল প্রয়োজন।
এ কারণে আখেরি চাহার সোম্বার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ বা বিশেষ পদ্ধতির ইবাদতকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন।
তাই কেউ যদি এ দিনে অন্যান্য দিনের মতো সাধারণ নফল ইবাদত করেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, কোরআন তিলাওয়াত করেন বা দান-সদকা করেন, তাহলে এসব সাধারণ নেক আমল নিজ নিজ মর্যাদায় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
নবীজি (সা.)-এর স্মরণ কীভাবে হতে পারে?
মহানবী (সা.)-এর জীবনের শেষ সময়ের কথা স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাঁর জীবন ও সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং তাঁর শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
মহান আল্লঅহ আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)
নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার ঘটনাগুলো আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি নামাজের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন।
সুতরাং তাঁর শেষ অসুস্থতার স্মরণ আমাদের মধ্যে যদি নামাজের প্রতি যত্ন, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং নবীজির সুন্নাহ অনুসরণের আগ্রহ তৈরি করে, সেটিই হবে সেই স্মরণের সবচেয়ে মূল্যবান ফল।




