নামাজ শেষে নবীজি (সা.) যেসব আমল করতেন

প্রতীকী ছবি
নামাজ শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট রুকন ও কিয়ামের সমষ্টি নয়; এটি বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক গভীর করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফরজ নামাজ শেষ হওয়ার পরও নবীজি (সা.)-এর ইবাদত থেমে যেত না। তিনি নামাজের পর বিভিন্ন জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন এবং সাহাবিদেরও এসব আমলের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই নামাজের পরের সময়টি একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এসব নবীজি (সা.)-এর করা কিছু আমল-
তিনবার ইস্তিগফার
নামাজ শেষ করেই নবীজি (সা.) তিনবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। সাওবান (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করার পর তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতেন। এরপর বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি শান্তির উৎস, আপনার কাছ থেকেই শান্তি। হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী, আপনি বরকতময়।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৯১)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নামাজের মতো মহান ইবাদত শেষ করার পরও নবীজি (সা.) ইস্তিগফার করতেন। এর মাধ্যমে উম্মতকে শেখানো হয়েছে, ইবাদত করেও নিজের আমলকে যথেষ্ট মনে না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়।
আল্লাহর জিকির করা
নামাজের পর জিকির করা নবীজি (সা.)-এর অন্যতম নিয়মিত আমল ছিল। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৩ বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে এবং একশ পূর্ণ করতে বলবে— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির’, তার গুনাহসমূহ সমুদ্রের ফেনার মতো হলেও ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (মুসলিম, হাদিস: ৫৯৭)
আয়াতুল কুরসি পাঠ
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আবু উমামা আল-বাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (নাসাঈ, হাদিস: ৯৮৪৮)
উল্লেখ্য যে, আয়াতুল কুরসি হলো সূরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। এতে আল্লাহর একত্ব, জ্ঞান, ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের অপূর্ব ঘোষণা রয়েছে।
তাওহিদের ঘোষণা
নামাজের পর নবীজি (সা.) যে জিকিরটি করতেন, তার মধ্যে তাওহিদের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুগিরা ইবনু শু‘বা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর বলতেন— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।’
অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’
এরপর তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা লা মানিআ লিমা আতাইতা, ওয়া লা মু‘তিয়া লিমা মানাতা, ওয়া লা ইয়ানফাউ যাল-জাদ্দি মিনকাল-জাদ্দ।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি যা দেন তা ঠেকানোর কেউ নেই এবং আপনি যা আটকে রাখেন তা দেওয়ার কেউ নেই। কোনো সম্পদশালীর সম্পদ আপনার কাছে তার কোনো উপকারে আসবে না।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৪৪)
তিন কুল পাঠ
ফজর ও মাগরিবের পর সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিনবার করে পাঠ করার কথা হাদিসে এসেছে। আর অন্য ফরজ নামাজের পর এগুলো একবার করে পাঠ করার কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনু খুবাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যায় এগুলো তিনবার করে পাঠ করলে তা তোমার জন্য সবকিছুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮২; তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭৫)
এ ছাড়া উকবা ইবনে আমির (রা.)-এর বর্ণনাতেও ফজর ও মাগরিবের পর তিন কুল পাঠের বিশেষ নির্দেশের কথা এসেছে। (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২৩; তিরমিজি, হাদিস: ২৯০৩)
দোয়া করা
নামাজের পর দোয়া করাও মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে নামাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোয়ার ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ছিল সালামের আগে দোয়া করার ওপর। তিনি তাশাহহুদের পর বিভিন্ন দোয়া শেখাতেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ তাশাহহুদ শেষ করলে সে যেন চারটি বিষয় থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়।’ এরপর তিনি দোয়াটি শিক্ষা দেন—
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসিহিদ্দাজ্জাল।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের আজাব, কবরের আজাব, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা এবং মসিহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৮৮)
এ থেকে বোঝা যায়, নামাজের পরের সময় যেমন জিকিরের সময়, তেমনি আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য দোয়া করারও গুরুত্বপূর্ণ সময়।
সুন্নত নামাজ আদায়
ফরজ নামাজের পর সংশ্লিষ্ট সুন্নত নামাজ আদায় করাও নবীজি (সা.)-এর নিয়মিত আমল ছিল। বিশেষ করে জোহরের পর দুই রাকাত, মাগরিবের পর দুই রাকাত এবং এশার পর দুই রাকাত সুন্নত তিনি আদায় করতেন।
ইবনে উমর (রা.) বলেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে দশ রাকাত সুন্নত সংরক্ষণ করেছেন: জোহরের আগে দুই ও পরে দুই, মাগরিবের পরে দুই, এশার পরে দুই এবং ফজরের আগে দুই রাকাত। (বুখারি, হাদিস: ১১৮০)
নামাজের পরের সময়টিও ইবাদতের
নামাজ শেষ হয়েছে মানেই আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের ইতি নয়। বরং নামাজের পরের জিকির ও দোয়াগুলো একজন মুমিনের হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘অতএব যখন তোমরা নামাজ শেষ করবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১০৩)
নবীজি (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, নামাজকে শুধু পাঁচ ওয়াক্তের নির্দিষ্ট কয়েক মিনিটের ইবাদতে সীমাবদ্ধ না রেখে এর প্রভাবকে পুরো জীবনে ছড়িয়ে দিতে হবে। নামাজের পরের কয়েকটি মিনিট তাই অযথা কথাবার্তা কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে হারিয়ে না দিয়ে জিকির, ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় কাটানো একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সুযোগ।
একজন মানুষ দিনে পাঁচবার নামাজের জন্য আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। আর প্রতিবার নামাজ শেষে কিছুক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ করার অভ্যাস তার হৃদয়কে ধীরে ধীরে গাফিলতি থেকে জাগিয়ে তোলে। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জায়নামাজ গুটিয়ে ফেলার আগে কয়েক মুহূর্ত থামা, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা, আল্লাহর প্রশংসা করা, তাঁর কাছে দোয়া করা এবং নিজের অন্তরকে তাঁর স্মরণে ভরিয়ে নেওয়া হতে পারে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাসগুলোর একটি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




