আল্লাহর ওপর ভরসার প্রকৃত রূপ

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নিজের সামর্থ্য, পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন প্রয়োজন হয় এমন এক আশ্রয়ের, যার ওপর নির্ভর করলে অনিশ্চয়তার মধ্যেও হৃদয় স্থির থাকে। ইসলামের পরিভাষায় এই নির্ভরতার নাম তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর আস্থা ও ভরসা। তবে তাওয়াক্কুলের অর্থ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তোমাদের সেভাবেই রিজিক দেওয়া হতো, যেভাবে পাখিদের রিজিক দেওয়া হয়। তারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)
এই হাদিসে তাওয়াক্কুলের প্রকৃত রূপটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। পাখি সকালে বাসা থেকে বের হয়। তার কাছে দিনের খাবারের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। কোথায় খাদ্য মিলবে তা সে জানে না; তারপরও সে বাসায় বসে থাকে না। খাবারের সন্ধানে আকাশে উড়ে যায়, বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করে এবং নিজের জন্য নির্ধারিত রিজিক অনুসন্ধান করে। সন্ধ্যায় সে ফিরে আসে পরিতৃপ্ত হয়ে। অর্থাৎ পাখির জীবনে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং কর্মপ্রচেষ্টা পাশাপাশি চলে।
এখানেই তাওয়াক্কুলের সঙ্গে অলসতার মৌলিক পার্থক্য। কেউ যদি বলে, ‘আল্লাহ রিজিক দেবেন’, অথচ রিজিক অর্জনের বৈধ চেষ্টা না করে, তবে সে হাদিসের শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করছে না। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) পাখির উদাহরণ দিয়েছেন, যে রিজিকের জন্য বেরিয়ে পড়ে। ইমাম তিরমিজি এই হাদিসকে তাওয়াক্কুলের অধ্যায়ের অধীনে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো আল্লাহর ওপর হৃদয়ের নির্ভরতা এবং দায়িত্ব পালনে মানুষের বাস্তব প্রচেষ্টার সমন্বয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ৩) আয়াতটি মুমিনের অন্তরে গভীর আস্থা তৈরি করে। তবে কোরআনুল কারীম একই সঙ্গে মানুষকে কর্মের জন্যও উৎসাহিত করেছে। বলা হয়েছে- ‘মানুষের জন্য তা-ই রয়েছে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা নাজম, আয়াত : ৩৯) অর্থাৎ মুমিনের দায়িত্ব চেষ্টা করা; ফলাফল তার হাতে নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এই ভারসাম্যের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। হিজরতের সময় তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। সফরের জন্য বাহন প্রস্তুত করা, পথের জন্য অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক নেওয়া, গোপন পথে যাত্রা করা এবং নির্দিষ্ট স্থানে আশ্রয় নেওয়া ছিল বাস্তব পরিকল্পনার অংশ। গারে সাওরে যখন শত্রুরা অত্যন্ত কাছে পৌঁছে যায়, তখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০) এখানে প্রস্তুতি ও তাওয়াক্কুল একে অপরের বিপরীত নয়; বরং পরিপূরক।
তাওয়াক্কুল মানুষের উদ্বেগকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। চাকরি না থাকলে কাজ খুঁজতে হবে, ব্যবসায় ক্ষতি হলে নতুন পরিকল্পনা করতে হবে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হবে, পরীক্ষার আগে অধ্যয়ন করতে হবে। এরপরও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না আসে, তখন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়... তোমার উপকারে আসে এমন বিষয়ে আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
তাওয়াক্কুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকা। মানুষ চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু সব ফল নিজের ইচ্ছামতো ঘটাতে পারে না। কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, সেচ দেন; কিন্তু বীজের ভেতর অঙ্কুরোদ্গমের শক্তি সৃষ্টি করা তার হাতে নেই। চিকিৎসক চিকিৎসা করেন, রোগী ওষুধ গ্রহণ করেন; কিন্তু সুস্থতা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। তাই তাওয়াক্কুল মানুষকে দায়িত্বশীলও করে, আবার বিনয়ীও করে।
আজকের উদ্বেগপ্রবণ জীবনে এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, জীবিকার অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতার চাপ কিংবা ব্যর্থতার ভয় মানুষের অন্তরকে ভারী করে তোলে। তাওয়াক্কুল তখন বলে, নিজের দায়িত্বটুকু যথাসাধ্য পালন করো, বৈধ পথে চেষ্টা করো, ভুল হলে সংশোধন করো এবং যে বিষয় তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও।
পাখি জানে না সন্ধ্যায় কোথায় তার খাবার মিলবে। তবু সে সকালবেলায় ডানা মেলে। এই ডানা মেলাই তার তাওয়াক্কুলের দৃশ্যমান ভাষা। মুমিনের জীবনেও তাই আল্লাহর ওপর ভরসা মানে পথ ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং আল্লাহর নাম নিয়ে পথে নেমে পড়া। হাতে থাকবে চেষ্টা, বিবেকে থাকবে দায়িত্ববোধ, আর হৃদয়ে থাকবে আল্লাহর ওপর অটুট আস্থা। এটাই তাওয়াক্কুলের প্রকৃত রূপ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



