হজের রুহ নষ্ট করে যে আচরণ
- হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ যে কারণে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হজ এমন এক ইবাদত, যেখানে মানুষ শুধু শরীর নিয়ে সফর করে না; বরং তার অন্তরও আল্লাহর দিকে যাত্রা শুরু করে। এ সফরে মানুষ দুনিয়ার পরিচয়, অহংকার ও বিভেদ পেছনে ফেলে এক সাদা ইহরামে দাঁড়ায় মহান রবের সামনে। তাই ইসলাম হজকে শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি বানায়নি; বরং এটিকে আত্মশুদ্ধি, চরিত্রগঠন ও তাকওয়ার প্রশিক্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণেই হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ, গালি-গালাজ ও সংঘর্ষকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ
‘হজের নির্ধারিত কয়েকটি মাস রয়েছে। যে ব্যক্তি এ মাসগুলোতে হজের সংকল্প করবে, তার জন্য হজে কোনো অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
এই আয়াতে ‘জিদাল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ তর্ক-বিতর্ক, কলহ ও ঝগড়া। মুফাসসিরগণ বলেছেন, হজের সময় মানুষের অন্তর যেন আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে, তাই সব ধরনের বিবাদ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইমাম তাবারি (রহ.) বলেছেন— ‘হজে ঝগড়া নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো, মানুষের হৃদয়কে গুনাহ ও ক্রোধ থেকে পবিত্র রাখা।’ (তাফসিরে তাবারি, ৩/৫৫৮)
হজে লাখ লাখ মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে একত্রিত হন। ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, স্বভাব ভিন্ন। ভিড়, ক্লান্তি, গরম, দীর্ঘ পথচলা ও শারীরিক কষ্টের কারণে সহজেই বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে। ইসলাম এ বাস্তবতাকে সামনে রেখেই হাজিদের ধৈর্য, সহনশীলতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— (যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকল, সে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২১; মুসলিম, হাদিস : ১৩৫০)
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন— ‘এ হাদিসে প্রমাণ হয়, হজের কবুলিয়াতের অন্যতম শর্ত হলো চরিত্র ও আচরণকে গুনাহ থেকে সংযত রাখা।; (শরহু সহিহ মুসলিম, ৯/১১৯)
হজের সময় ঝগড়া নিষিদ্ধ হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। এখানে সব মুসলমান একই কাবার দিকে মুখ করে, একই পোশাক পরে, একই তাওয়াফে অংশ নেয়। যদি এ ময়দানেও মানুষ বিভেদ, অহংকার ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে হজের মূল শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন— ‘হজ মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও বিনয়ের শিক্ষা দেয়। তাই বিবাদ এ ইবাদতের রুহ বা আত্মার পরিপন্থী।’ (আল-জামিউল আহকামিল কোরআন, ২/৪০৮)
আজকের যুগে ঝগড়া শুধু মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক সময় হজকে কেন্দ্র করে তর্ক, দলাদলি ও কটূক্তি দেখা যায়। কেউ মাযহাব নিয়ে, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে, কেউ ছবি তোলা বা আমলের পদ্ধতি নিয়ে অন্যকে আক্রমণ করে। অথচ হজের প্রকৃত শিক্ষা হলো নম্রতা ও সহমর্মিতা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০)
হজের সময় এ হাদিসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ একটি কঠিন শব্দ, একটি ধাক্কা বা একটি অপমান অন্য হাজির ইবাদতের মনোযোগ নষ্ট করে দিতে পারে।
ফকিহগণ বলেছেন, হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষ কোনো প্রয়োজনীয় আলোচনা করবে না। বরং নিষিদ্ধ হলো অহংকার, ক্রোধ, অপমান ও শত্রুতাপূর্ণ তর্ক। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিনয়ী আলোচনা বা প্রয়োজনীয় পরামর্শ এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন— ‘এখানে নিষিদ্ধ জিদাল হলো এমন তর্ক, যা মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।’ (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/৫৩৭)
হজের সফর মূলত ধৈর্যের সফর। আর ধৈর্য ছাড়া হজের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না। আরাফার গরম, মিনার ভিড়, দীর্ঘ হাঁটা, ঘুমের কষ্ট, খাবারের অসুবিধা; সবকিছুই যেন মানুষের নফসকে পরীক্ষা করে। যে ব্যক্তি এসব অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে হজের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে।
তাই হজে ঝগড়া-বিবাদ নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে শুধু সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয় নেই; বরং এর গভীরে আছে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহমুখী হৃদয় গঠনের মহান শিক্ষা।
মহান আল্লাহ আমাদের এমন হজ করার তাওফিক দিন, যেখানে আমাদের জিহ্বা, আচরণ ও অন্তর সবকিছু তাঁর সন্তুষ্টির জন্য পবিত্র থাকে। আমিন।






