সুন্দর জীবনযাপনের নববী মূলনীতি

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সময়। অথচ এই সময়ের বড় একটি অংশ আমরা এমন সব কথা, কাজ ও বিষয়ে ব্যয় করি, যার সঙ্গে আমাদের প্রকৃত প্রয়োজন বা কল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম মানুষকে শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি, বরং জীবনের কোন বিষয় গ্রহণ করতে হবে আর কোন বিষয় এড়িয়ে যেতে হবে, সে ব্যাপারেও দিয়েছে গভীর দিকনির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো, সে তার জন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
হাদিসটি মানুষের চরিত্র ও জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে। ‘যা তার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়’ বলতে শুধু অনর্থক কথাবার্তা বোঝায় না; বরং এমন সব কাজ, আলোচনা, অনুসন্ধান ও ব্যস্ততাও এর অন্তর্ভুক্ত, যার সঙ্গে মানুষের দায়িত্ব, প্রয়োজন কিংবা কল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই একজন মুমিনের জন্য সব বিষয়ে নাক গলানো উচিত নয়। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে যাওয়াও নিষ্প্রয়োজন। প্রত্যেক বিতর্কে নিজেকে জড়াবনোও অহেতুক কাজ।
বিশেষ করে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অযথা আগ্রহী হওয়া ইসলামের এই শিক্ষার পরিপন্থী। কে কী করল, কার সংসারে কী ঘটল, কে কোথায় গেল কিংবা কে কী মন্তব্য করল, এসব বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় অনুসন্ধান মানুষের সময় নষ্ট করার পাশাপাশি তাকে গিবত, অপবাদ ও কুৎসার মতো গুনাহের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গিবত করো না।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ১২)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই হাদিসের শিক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের পোস্ট, ছবি, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা মন্তব্য নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যস্ত থাকা এখন খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অনেক সময় এমন বিষয় নিয়েও আমরা মতামত দিই, যা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নেই এবং জানারও প্রয়োজন নেই। অথচ কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৩৬)
জিহ্বার ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১৮) অর্থাৎ কথা বলার অধিকার থাকলেই প্রতিটি কথা বলা জরুরি নয়। কখনো নীরব থাকাও প্রজ্ঞার পরিচয়। কারণ একটি অনর্থক কথা কখনো বিবাদ সৃষ্টি করতে পারে, সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, এমনকি মানুষকে গুনাহের মধ্যেও ফেলতে পারে।
একজন মুমিন বান্দার জেনে রাখা উচিত যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য আছে। তাই নিজের সময়, দৃষ্টি, জিহ্বা ও মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে হবে, ‘আমি যে বিষয়ে এখন ব্যস্ত, এটি কি আমার জন্য সত্যিই প্রয়োজনীয়? এতে কি আমার কোনো উপকার হবে? এটি কি আমার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে আসবে?’
যে মানুষ অপ্রয়োজনীয় বিষয় ছেড়ে দিতে শেখে, তার জীবন ধীরে ধীরে শৃঙ্খলিত হয়, মন প্রশান্ত হয় এবং চরিত্রে সংযম আসে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই সংক্ষিপ্ত হাদিস শুধু একটি নৈতিক পরামর্শ নয়; এটি একজন মুমিনের সুন্দর জীবনযাপনের অন্যতম মূলনীতি। সবকিছুতে জড়িয়ে পড়া নয়, বরং কোন বিষয় থেকে সরে আসতে হবে তা বুঝতে পারাই পরিণত ঈমান ও সুন্দর ইসলামের পরিচয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



