যখন কেউ দেখে না, তখনও কেউ দেখেন

প্রতীকী ছবি
রাত গভীর। ঘরের দরজা বন্ধ। চারপাশে নীরবতা। পৃথিবীর কোনো চোখ এই মুহূর্তের সাক্ষী নয়। মানুষ চাইলে এখন এমন কিছু করতে পারে, যা দিনের আলোয় বা মানুষের সামনে কখনোই করার সাহস পেত না। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, মানুষের চোখের আড়ালে যাওয়া মানেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়। কারণ যখন কেউ দেখে না, তখনও কেউ দেখেন।
এই অনুভূতিই তাকওয়ার প্রাণ। মানুষ যখন একা থাকে, তখন তার আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য ভালো থাকা সহজ; কিন্তু কেউ দেখছে না, জানছে না, প্রশংসাও করবে না, তবু অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা ঈমানের শক্তির পরিচয়।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা আল-হাদিদ, আয়াত : ৪)। এই আয়াত মুমিনকে শেখায়, পৃথিবীর কোনো স্থান আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়। ঘরের দরজা বন্ধ হতে পারে, পর্দা নামানো থাকতে পারে, মোবাইলের স্ক্রিন ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন নয়।
পবিত্র কোরআন আরও ঘোষণা করেছে, ‘তিনি চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন করে তা জানেন।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ১৯)। মানুষ হয়তো শুধু কাজটি দেখে; আল্লাহ জানেন কাজটির পেছনের নিয়তও। মানুষ হয়তো মুখের কথা শোনে; আল্লাহ জানেন অন্তরের কথাও। তাই ইসলামী নৈতিকতা শুধু ব্যক্তির বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তার অন্তরকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যাতে সে নির্জনেও নিজেকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত মনে করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইহসান হলো তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর তুমি যদি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি তো তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০; মুসলিম, হাদিস : ৮)। ইহসানের এই শিক্ষা মানুষের ভেতরে এক অদৃশ্য প্রহরী তৈরি করে। সেখানে পুলিশ নেই, ক্যামেরা নেই, মানুষের ভয় নেই; আছে শুধু আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি।
আজকের ডিজিটাল যুগে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট পর্দার আড়ালে মানুষ এমন অনেক কিছু করতে পারে; যার কোনো সাক্ষী থাকে না। একাকী অবস্থায় হারাম দেখা, গোপনে অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়া, অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, প্রতারণা করা কিংবা কারও অজান্তে তার অধিকার নষ্ট করা খুব সহজ। কিন্তু মুমিনের হৃদয় তাকে থামিয়ে দেয়: ‘কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন।’
আর এই বিশ্বাস যেমনভাবে গোপন পাপ থেকে বাঁচায়; তেমনিভাবে গোপন নেক আমলের পথও খুলে দেয়। এমন দান; যার কথা কেউ জানে না, এমন দোয়া; যা শুধু আল্লাহ শোনেন, এমন কান্না; যার সাক্ষী শুধু রাতের অন্ধকার, এমন কোনো গুনাহ ছেড়ে দেওয়া; যার খবর পৃথিবীর কেউ কখনো জানবে না, এগুলোই একজন মুমিনের অন্তরের সৌন্দর্য।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যদি দান প্রকাশ্যে করো, তবে তা উত্তম; আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭১)। গোপন আমলের এই সৌন্দর্য মানুষকে প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আরশে আযীমের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। তাদের একজন হলেন সেই ব্যক্তি, ‘যাকে কোনো মর্যাদাসম্পন্ন ও সুন্দরী নারী আহ্বান করল, আর সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৬০; মুসলিম, হাদিস : ১০৩১)। এখানে কোনো মানুষের ভয় তাকে থামায়নি; থামিয়েছে আল্লাহর ভয়।
তাই নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার: মানুষের চোখের আড়ালে আমি কেমন? কারণ আমাদের প্রকৃত পরিচয় শুধু জনসমক্ষে নয়, নির্জনতার মধ্যেও লেখা হয়।
একদিন এমন সময় আসবে, যখন কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন মানুষকে তাদের কাজ দেখানো হবে।’ (সুরা যিলযাল, আয়াত : ৬)।
তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পৃথিবীর চোখ বন্ধ হতে পারে, মানুষ ভুলে যেতে পারে, প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কিছুই হারায় না।
যখন কেউ দেখে না, তখনও কেউ দেখেন। আর সেই একজনের দৃষ্টি মনে রাখাই তাকওয়ার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বাবস্থায় গোনাহমুক্ত জীবন ধারণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







