হতাশার অন্ধকারে নববী আলো

প্রতীকী ছবি
জীবন কখনো সরলরেখায় বা একই ধারায় পরিচালিত হয়না। কখনো চারপাশ সাফল্যের আলোয় ভরে যায়। আবার কখনো ব্যর্থতা, দুঃখ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মানুষকে এমন এক অবস্থার মধ্যে দাঁড় করায়, যেখানে সে কোনো পথ দেখতে পায় না। তখন অন্তরে জন্ম নেয় হতাশা। ভাবতে থাকে আর বুঝি কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই। অথচ ইসলামের জীবনদর্শনের মূলনীতি বলে, কোনো অন্ধকারই আল্লাহর রহমতের চেয়ে বড় নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি প্রিয়জন হারিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, যুদ্ধ ও সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কোনো বিপদই তাঁকে আল্লাহর ওপর আস্থা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাই হতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য তাঁর জীবন ও বাণী হতে পারে সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আলামনাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)। একই কষ্টের সঙ্গে দুবার স্বস্তির ঘোষণা যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, সংকটের ভেতরেই আল্লাহ মুক্তির পথ তৈরি করে রাখেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করা মুমিনের কাজ নয়।
হতাশা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই একটি দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হাযানি।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা থেকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩৬৯)।
এই দোয়ার মধ্যে রয়েছে একটি গভীর শিক্ষা। দুঃখকে অস্বীকার করতে হবে না, বরং দুঃখের মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। কারণ মানুষ যখন সব আশ্রয় হারায়, তখনও আল্লাহর দরজা খোলা থাকে।
হতাশার আরেকটি বড় কারণ অতীতের ব্যর্থতা। মানুষ বারবার ভাবতে থাকে, ‘আমি যদি সেদিন অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম!’ এভাবে অতীতের ভুল বর্তমানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বলের তুলনায় আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক প্রিয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে, যাতে তোমার উপরকার হবে তার প্রতি তুমি লালায়িত হয়ো এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অক্ষম হয়ে থেকো না। যদি কোন কিছু (বিপদ) তোমার উপর আপতিত হয় তবে এরূপ বলবে না যে, যদি আমি এরূপ করতাম তবে এরূপ এরূপ হত। বরং এই বল যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা, তোমার لَوْ (যদি) শব্দটি শয়তানের আমলের দুয়ার খুলে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)।
এর অর্থ এই নয় যে ইসলাম মানুষকে চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে শেখায়। বরং মহানবীজ (সা.) শিখিয়েছেন, চেষ্টা করতে হবে, আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে এবং ফলাফল তাঁর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। ব্যর্থতা মানেই পরাজয় নয়; অনেক সময় ব্যর্থতা মানুষকে এমন একটি পথ থেকে ফিরিয়ে আনে, যার পরিণতি তার জন্য ভালো ছিল না।
হতাশ মানুষের জন্য কুরআনের সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্বাসগুলোর একটি হলো, “আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।” (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩)। একজন মানুষ যত ভুলই করুক, যত দূরেই সরে যাক, আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায় না। তাই গুনাহের কারণে হতাশ না হয়ে তাওবার দিকে ফিরে আসতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর... সুখ পেলে সে শুকরিয়া আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণকর; আর বিপদে পড়লে সে ধৈর্য ধারণ করে, সেটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)।
অতএব, জীবনে দুঃখ আসবে, চোখে পানি আসবে, কখনো মানুষ ভেঙেও পড়বে। কিন্তু একজন মুমিনের হৃদয়ে একটি বিশ্বাস অটুট থাকবে: আমার রব আমাকে দেখছেন, আমার কান্না শুনছেন এবং আমার কষ্টের অর্থ আমি না বুঝলেও তিনি তা জানেন।
হয়তো আজকের বন্ধ দরজাটিই আগামী দিনের নতুন পথের সূচনা। হয়তো আজকের অশ্রুই আগামী দিনের শুকরিয়ার কারণ হবে। তাই হতাশার মুহূর্তে নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে, রাত যত দীর্ঘই হোক, ফজর আসবেই। আর আল্লাহর ওপর যার ভরসা আছে, তার জীবনে কোনো রাতই চিরস্থায়ী নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







