জীবনস্বত্ব হেবা শরিয়তসম্মত নয়— মতামত দিয়েছিলেন বায়তুল মোকাররমের খতিব

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক। ছবি: সংগৃহীত
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘হেবা’ ইসলামী শরিয়তে স্বীকৃত একটি বৈধ পদ্ধতি। জীবিত ব্যক্তি তার নিজস্ব সম্পত্তি অন্য কাউকে দান করতে পারেন। তবে হেবা শুধূ একটি নাম বা কাগজে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে মালিকানা হস্তান্তর, দখল প্রদান এবং হেবার তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু শরয়ী বিধান জড়িত থাকে। ফলে রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থায় হেবার নামে কোনো নতুন পদ্ধতি চালু হলে তার সঙ্গে শরিয়তের হেবার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
সম্প্রতি এমন একটি আইন ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। যাতে জীবিত ব্যক্তি তার সম্পত্তি হেবা করে দেওয়ার পরও ওই সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, ভোগদখল ও আয় নিজের জীবদ্দশার জন্য সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং তার মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি হেবাগ্রহীতার কাছে চলে যাবে। এই ব্যবস্থার শরয়ী অবস্থান জানতে চেয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব মো. আশিকুল ইসলাম জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকার আমীনুত তালীম মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেককে প্রশ্ন করেছিলেন। তার জবাব তিনি কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে এটিকে শরিয়তসম্মত মতামত দিয়েছেন।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের মতামতটি হুবহু দেখতে ক্লিক করুন
সেই মাতামতে উঠে এসেছে যে, েএই আইনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামী হেবার প্রকৃতি এবং মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে মিরাসের বিধানের প্রশ্ন। তাই সেগুলোর আলোচনা জররী।
হেবার প্রকৃতি কী?
ফিকহের পরিভাষায় হেবা হলো বিনিময় ছাড়াই জীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তির মালিকানা অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, হেবা দাতার জীবদ্দশায় সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ দাতা যখন কোনো সম্পত্তি হেবা করেন এবং হেবা শরয়ীভাবে সম্পূর্ণ হয়, তখন সম্পত্তিটি আর দাতার মালিকানায় থাকে না; গ্রহীতা তার মালিক হন।
এ কারণে হেবার সঙ্গে দখল হস্তান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ঘোষণা বা দলিল তৈরি করলেই সব ক্ষেত্রে হেবা পূর্ণ হয়ে যায় না; গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির দখল ও নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে অর্পিত হওয়া হেবার পূর্ণতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ফিকহের গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে (কিফায়াতুল মুগতাযী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪১০)।
এখানে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ’ শর্তটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ, একজন ব্যক্তি যদি সম্পত্তি অন্যকে হেবা করার পরও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওই সম্পত্তির দখল, ভোগ, আয় ও ব্যবস্থাপনা নিজের জন্য রেখে দেন, তাহলে হেবার মাধ্যমে তাঁর মালিকানা বাস্তবে কখন শেষ হলো এবং গ্রহীতার মালিকানা কখন শুরু হলো, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
হেবা কি মৃত্যুর পর কার্যকর হতে পারে?
শরিয়তের দৃষ্টিতে হেবা ও মৃত্যুর পর সম্পত্তি হস্তান্তর এক বিষয় নয়। হেবা হলো জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান। আর কোনো সম্পত্তি এমনভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, যার কার্যকারিতা দাতার মৃত্যুর পর শুরু হবে, তা হেবার মৌলিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কারও বক্তব্য যদি এমন হয়, ‘আমি সম্পত্তিটি এখনই হেবা করলাম, তবে আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর দখল, আয় ও ভোগ আমার থাকবে; আমার মৃত্যুর পর এটি গ্রহীতার মালিকানায় যাবে’, তাহলে বাস্তবে সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা জীবদ্দশায় গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে না। বরং মৃত্যুকে মালিকানা কার্যকরের সময় হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে।
ফলে ব্যবস্থাটির নাম ‘হেবা’ হলেও তার বাস্তব প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। শরিয়তে কোনো লেনদেনের শুধু নাম নয়, তার প্রকৃত স্বরূপ ও ফলাফল বিবেচিত হয়।
মিরাসের সঙ্গে সংঘাত কোথায়?
এখানে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক বিষয়টি সামনে আসে। মানুষের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি কারা পাবেন এবং কে কতটুকু পাবেন, তা কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারণ করেছে। সুরা আন-নিসায় উত্তরাধিকারীদের অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা বলেন, এগুলো ‘আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৩)।
অতএব একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তি বৈধভাবে হস্তান্তর করতে পারেন, কিন্তু মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতে যেসব উত্তরাধিকারীর অধিকার শরিয়ত নির্ধারণ করেছে, সেই বিধানকে কোনো কৌশলের মাধ্যমে অকার্যকর করা শরিয়তের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১১৭)
এই হাদিসের আলোকে উত্তরাধিকারীর নির্ধারিত অধিকারকে পাশ কাটানোর জন্য মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো কৌশল অবলম্বনের বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
জীবদ্দশার হেবা আর মৃত্যুকালীন ব্যবস্থা এক নয়
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় নিজের সম্পত্তি জীবিত থাকতেই কাউকে হেবা করে দিলেন এবং শরিয়তসম্মতভাবে তার দখলও বুঝিয়ে দিলেন, তাহলে সেটি তার জীবদ্দশার বৈধ সম্পত্তি হস্তান্তর। পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু হলে ওই সম্পত্তি আর তার মালিকানাধীন সম্পত্তির অংশ থাকবে না।
কিন্তু হেবা করার নামে যদি মালিকানা ও দখল নিজের কাছেই রেখে দেওয়া হয় এবং গ্রহীতার অধিকারকে দাতার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে বিষয়টি আর সরল হেবা থাকে না। কারণ হেবার মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো জীবিত অবস্থায় মালিকানা হস্তান্তর।
এ কারণেই প্রস্তাবিত ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে হেবা’ ব্যবস্থার শরয়ী বিশ্লেষণে এর নামের পরিবর্তে প্রকৃত কার্যকারিতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শরিয়তসম্মত পথ কী?
কেউ যদি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি হেবা করতে চান, শরিয়ত তাকে সে অধিকার দিয়েছে। তিনি তার মালিকানাধীন সম্পত্তি বৈধভাবে হেবা করতে পারেন এবং হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রহীতার মালিকানা ও দখল প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু একই সম্পত্তির ওপর নিজের আজীবন মালিকানা, ভোগদখল ও আয় সংরক্ষণ করে রেখে সেটিকে এমন হেবা হিসেবে গণ্য করা, যার প্রকৃত কার্যকারিতা মৃত্যুর পর শুরু হবে, তা শরিয়তের হেবার মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অবশ্য মৃত্যুর পর কোনো ওয়ারিশ নিজের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় তা অন্য ওয়ারিশকে দিয়ে দিলে সেটি ভিন্ন বিষয়। সেখানে মৃত ব্যক্তি উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করছেন না; বরং উত্তরাধিকারী নিজের মালিকানাধীন অংশ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সুতরাং ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে হেবা’ নিয়ে শরয়ী আলোচনার মূলকথা হলো, হেবার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার মাধ্যমে হেবার মৌলিক শর্তগুলো অকার্যকর হয়ে যায় কিংবা মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে তা কার্যত মিরাসের বিধানের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামী শরিয়তে সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধ পথ যেমন নির্ধারিত আছে, তেমনি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের বিধানও নির্ধারিত। হেবা জীবদ্দশার লেনদেন, আর মিরাস মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া শরয়ী অধিকারব্যবস্থা। দুটিকে এক করে দেখলে উভয়ের স্বতন্ত্র বিধানই অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাই আধুনিক আইনগত কাঠামোয় হেবার যে কোনো নতুন রূপ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে তার নামের চেয়ে শরিয়তের নির্ধারিত সংজ্ঞা, শর্ত ও বাস্তব ফলাফলকেই মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: কোরআন, সুরা আন-নিসা, আয়াত :১১-১৪; জামে তিরমিজি, হাদিস ২১১৭; কিফায়াতুল মুগতাযী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪১০; মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা থেকে প্রদত্ত ফতোয়া; যার পিডিএফ এখানে যুক্ত করা হয়েছে।







