রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
দলে বিশ্বস্ততা বাইরে গ্রহণযোগ্যতা এই দুই বিবেচনায় মির্জা ফখরুল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এবার আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না ক্ষমতাসীন বিএনপি। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে বসাতে চায় দলটি, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় দলের প্রতি যেমন বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছেন, তেমনি দলমতের বাইরেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। এই দুই বিবেচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, মামলা-হামলা ও কারাবরণ সহ্য করা এবং নানা চাপের মুখেও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অবিচল থাকা— সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলই সবচেয়ে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পছন্দ। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মহলেও তার যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, সেটিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।
বিএনপির নেতাদের পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে আগের দুটি অভিজ্ঞতা দলটির জন্য সুখকর ছিল না। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করেছিল বিএনপি। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে দলটির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সাড়ে সাত মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়।
এরপর রাষ্ট্রপতি করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন। সে সময় তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকট শক্ত হাতে সামাল দিতে না পারায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। তাদের মতে, ওই সংকটের ধারাবাহিকতাতেই পথ তৈরি হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের, যার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে পড়ে বিএনপি।
এই অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলটি অনেক বেশি সতর্ক। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ধারণা, রাষ্ট্রপতি পদটি এখন আর শুধু আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক পদ নয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এমন কাউকে এ পদে বসাতে চায় বিএনপি, যিনি দলীয় নেতৃত্বের কাছে আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও গ্রহণযোগ্য।
যদিও এ বিষয়ে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে নারাজ বিএনপির শীর্ষ নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তার পছন্দেই রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
সংকটে দলের ‘আস্থার মানুষ’: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাকেই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখছে বিএনপির হাইকমান্ড। দলের কঠিন সময়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও নানা রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরছেন বিএনপির নেতারা।
দলীয় সূত্রের দাবি, গত ১৬ বছরে মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে। তাকে ১১ বার কারাগারে যেতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। রাজপথের আন্দোলনে পুলিশের টিয়ার শেল, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখেও দলীয় অবস্থান থেকে সরে যাননি।
বিএনপির নেতাদের মতে, দল ভাঙতে তৎকালীন সরকারের নানা উদ্যোগ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও মির্জা ফখরুল দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ধরে রাখেন। বিশেষ করে জিয়া পরিবারের প্রতি তার আনুগত্য ও আস্থাকে দলের হাইকমান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
শুধু দলীয় আনুগত্য নয়, মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও রাষ্ট্রপতি পদে তাকে এগিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পর্ক ভালো। সুশীল সমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেও তিনি গ্রহণযোগ্য। দীর্ঘদিন রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গেও কাজ করার কারণে বিদেশি রাষ্ট্র ও কূটনীতিকদের কাছেও তার পরিচিতি রয়েছে।
রাজনীতি ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞতা: বিএনপির নেতারা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি পদে শুধু দলীয় আনুগত্য যথেষ্ট নয়; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। সে জায়গায় মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বড় সম্পদ হতে পারে।
আওয়ামী লীগবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে মাঠের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির নানা দিক সম্পর্কেও তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দলীয় ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন বলে আশা করছে বিএনপি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলমও মনে করেন, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাষ্ট্রপতি পদে তাকে যোগ্য করে তুলেছে।
তিনি বলেছেন, মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি দলের অত্যন্ত কঠিন সময়ে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তখন দলকে ভাঙার অনেক চেষ্টা হয়েছিল, বিভিন্ন এজেন্সিও কাজ করেছিল। কিন্তু তিনি দলকে একসুতোয় ধরে রেখেছেন।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে জিয়া পরিবারের প্রতি মির্জা ফখরুলের যে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস, তা কখনো নষ্ট হয়নি। অর্থাৎ দলের প্রতি তিনি বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেছেন, দলের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও মির্জা ফখরুলের একটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি রয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত। দীর্ঘদিন নির্যাতন, কারাবরণ এবং রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তাকে রাজপথের একজন সৈনিক হিসেবেও দেখা যায়।
অধ্যাপক শামছুল আলমের ভাষায়, এসব বিষয় বিবেচনা করেই হয়তো বিএনপির হাইকমান্ড তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের জন্য বেছে নিয়েছে। তাকে এই পদে দায়িত্ব দিলে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ হবে বলে আশা করা যায়। গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে বেছে নিতে চাইছে বিএনপি, যিনি দলের কাছে পরীক্ষিত, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে বিশ্বস্ত এবং দলীয় গণ্ডির বাইরেও গ্রহণযোগ্য। সেই সমীকরণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই এখন দলটির সবচেয়ে আস্থার নাম।




