তিন কারণে সাহাবুদ্দিনকে সুরক্ষা দেবে বিএনপি
- বিএনপির মূল্যায়ন ৫ আগস্টের পরের সাহাবুদ্দিন
- সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব
- অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চায় না সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠলেও সরকার তার আইনি সুরক্ষা এবং আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়; বরং চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা, ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকট সামাল দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উত্তরণ নিশ্চিতে তার ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার ক্ষেত্রে উল্লিখিত তিনটি বিষয় সরকারের মূল্যায়নে অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
তা ছাড়া মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিকভাবেও অসুস্থ; সরকারে স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে চায় ক্ষমতাসীনরা। সে কারণে রাজনৈতিক চাপ বা দাবির ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপে যেতে আগ্রহী নয় সরকার। তবে সরকার এও মনে করে, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি নিষ্পত্তি হবে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ অবস্থায় রাষ্ট্র তিন দিন সরকারবিহীন থাকার পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদে থাকা নিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রসঙ্গ এনেছিল দলটি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেশ কয়েকবার তাকে সরানোর প্রসঙ্গ এলেও বিএনপি তখন রাষ্ট্রপতির পাশে থাকায় সেটি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারও মনে করছে, ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়লে দেশে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারত। এতে করে দেশের গণতন্ত্র উত্তরণে নির্বাচন অনুষ্ঠানও অনিশ্চিত ও বিলম্বিত হয়ে পড়ত। সেই সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত ও অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের সাংবিধানিক পথ উন্মুক্ত রাখেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দৃঢ়তার কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছিল। এ কারণেই তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ থাকলেও সরকার সেটিকে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনের শাসন বজায় রেখে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন গত শুক্রবার। এর পরপরই সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানায় এনসিপি। তাদের অভিযোগ, তিনি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তার কিছু কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলন নিয়ে তার কিছু মন্তব্য এবং অতীতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে দলগুলো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। ইনকিলাব মঞ্চসহ কয়েকটি সংগঠনও একই দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে গত রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত দাবি জানায় বাংলাদেশ আজাদী পার্টি ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামে দুটি সংগঠন।
তবে সরকারের অবস্থান হলো, রাজনৈতিক দাবি এবং আইনি প্রশ্ন এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে তার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধান যে সুরক্ষা দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রবিবার বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় স্বৈরাচারের েশষদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড; তার ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) আছে। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। কোনো দল যদি বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেই স্বাধীনতা তাদের আছে; দিতে পারে। কিন্তু আমলে নেওয়ার মতো কিছু দেখছি না। তবে দায়িত্বকালের বাইরের কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিবেচিত হতে পারে।’
এদিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও সম্প্রতি বলেছেন, মো. সাহাবুদ্দিন ফ্যাসিস্ট আমলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পেলেও ৫ আগস্টের পর জনগণের স্বার্থ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার এ বক্তব্যও সরকারের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাংবিধানিক শূন্যতা রোধ করা। সে সময় রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকেই ধারাবাহিকভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের পথ সুগম করা হয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ উত্তরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সরকারের মূল্যায়নে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সংকটকালে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং সেনাবাহিনী প্রধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যে কারণে পরে দেশের মধ্যে বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও সেটি ওই মাত্রায় ঘটেনি। ওই সময় কোনোভাবে যদি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতেন, দেশে বড় আকারের সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতো। এতে করে বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচনটা পিছিয়ে যেত। সুতরাং তখন রাষ্ট্রপতির পক্ষে বিএনপির অবস্থান সঠিক ছিল।’
‘অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি এখন রিজাইন করলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন— দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে এগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখন দু-একটি দল থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার-বিচারের যে দাবি তোলা হয়েছে— সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা আইনমন্ত্রীর যে বক্তব্য, সেগুলো যথার্থই মনে করি’— যোগ করলেন তিনি।




