৭ নভেম্বর: ছাপার অক্ষরে সেই দিনের বয়ান

১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বরের দৈনিক বাংলায় ৭ নভেম্বরের ঘটনার বিবরণ। ছবি: সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে
৭ নভেম্বর, দিন একটিই, কিন্তু এর রয়েছে নানা মাত্রা। সব কিছু পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে দিনটি। এই দিনেই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক জিয়াউর রহমান। তারপর রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আসীন হওয়ার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী একটি আসন হয়ে যায় তার।
স্বাধীনতার চতুর্থ বছরে এসে দেশের রাজনীতিতে ঝড় বয়ে যায়। শুরুটা হয়েছিল জানুয়ারি মাসে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে। পরের মাসে বাকশাল গঠনের মধ্যদিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থার পথে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ।
ছয় মাস পর ১৫ আগস্ট একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ঘোলাটে। রাষ্ট্রপতির শূন্য আসনে খন্দকার মোশতাক আহমেদ বসলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছিল না।
এমন অবস্থায় ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান।
এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান মোশতাক। জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন সেনাপ্রধান। নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন খালেদ মোশাররফ। জিয়াউর রহমান হন সেনানিবাসের বাড়িতে গৃহবন্দি।
উৎকণ্ঠাময় পরিস্থিতি চলছিল সেনানিবাসে। তারমধ্যে আরেক সেক্টর কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহেরে নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। সেই অভ্যুত্থানে মুক্ত হন জিয়া; নিহত হন খালেদ মোশাররফ।
৩ নভেম্বর থেকে যে উৎকণ্ঠা চলছিল, তা চরমে পৌঁছেছিল ৭ নভেম্বর। আর তারপরই এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফেরে দেশে। যার প্রতিফলন ঘটেছিল ৮ নভেম্বরের দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আনন্দ উদ্বেল মানুষের ঢল নেমেছিল’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে।
কেমন ছিল, সেই ৭ নভেম্বর; তা বোঝা যায় পরদিনের সংবাদপত্রগুলোর পাতায় চোখ রাখলে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্র দৈনিক বাংলায় ৮ কলামের শিরোনাম ছিল- ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব’। এই শিরোনামের শোল্ডারে ছিল- ‘আমাদের স্বাধীনতা রাখবোই রাখবো’।
প্রতিবেদনের শুরুটা হয়েছিল এভাবে- ‘মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহী ও জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সফল হয়েছে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার চার দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহরের হয়েছে অবসান।’
রেডিও বাংলাদেশ থেকে জিয়ার ভাষণ দেওয়ার কথাও বলা হয় সেই প্রতিবেদনে, যেখানে বলা হয় যে তিনি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনস্ট্রেটর ও সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আলাদা বেতার ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম জানান যে তিনি প্রধান সামরিক কর্তার দায়িত্বভার নিয়েছেন।
সেদিন দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয় চলে এসেছিল প্রথম পাতায়, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শিরোনামে। তার পাশে ছিল ‘সামরিক আইন প্রশাসন গঠিত’ শিরোনামের তিন কলামের একটি প্রতিবেদন।
মাল্যভূষিত জিয়াউর রহমানের দুই কলামের ছবির পাশের এক কলামের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘আমি জিয়া বলছি’। এতে জিয়ার সংক্ষিপ্ত বেতার ভাষণটি তুলে ধরা হয়। জিয়া বলছিলেন- ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার ও জওয়ানদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে।’ জনগণকে জিয়া ধন্যবাদ জানিয়েছেন, এমন একটি প্রতিবেদনও ছিল তার নিচে ‘ধন্যবাদ’ শিরোনামে।
উৎফুল্ল জনতা সৈনিকদের একটি ট্যাংকের গোলার নলে মালা পরিয়ে দিচ্ছেন, এমন একটি ছবিও প্রথম পাতায় ছাপায় দৈনিক বাংলা।
বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছিল এক কলামের একটি প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল- ‘সম্ভব হলে ৭৭ এর ফেব্রুয়ারির আগে নির্বাচন’।
প্রথম পাতার নিচের দিকে দুই কলামের একটি প্রতিবেদন ছিল সদ্য বিদায় নেওয়া রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমদের ভাষণ নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘এক্ষণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্দলীয় ব্যক্তি প্রয়োজন’।
তার পাশে এক কলামের একটি প্রতিবেদনে ৫ রাজনীতিকের মুক্তির খবর স্থান পায়। তারা হলেন- শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মোহাম্মদ শাহজাহান, আব্দুল আউয়াল ও মির্জা সুলতান।
নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী সম্পাদিত সেদিনের দৈনিক বাংলার শেষ পাতাটি সাজানো হয়েছিল আগের দিনের ছবি দিয়ে। সেখানে জিয়ার একটি এবং আবু সাদাত সায়েম ও খোন্দকার মোশতাকের একটি ছবি ছিল। অন্য ছবিগুলো ছিল ঢাকার পথে সিপাহী ও জনতার উল্লাস নিয়ে।
৮ নভেম্বরের সংবাদের মূল শিরোনাম ছিল- ‘সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত’। পাঁচ কলামের প্রধান সংবাদের পাশে ছিল তিন কলামের একটি ছবি, যেখানে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিমানবাহিনী প্রধান এম জি তাওয়াব এবং নৌবাহিনী প্রধান মোশাররফ হোসেন।
ছবির নিচে দুই কলামের একটি প্রতিবেদন ছিল ‘দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি জিয়ার অভিনন্দন’ শিরোনামে। জাতির উদ্দেশে নতুন রাষ্ট্রপতির সায়েমের ভাষণ নিয়ে ছিল তিন কলামের একটি প্রতিবেদন।
সংবাদে এক কলামের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাপ্রধানের পদ থেকে ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের যে পদত্যাগপত্র গ্রহণের যে আদেশ হয়েছিল, তা বাতিল করা হলো। সেই সঙ্গে বাতিল হয়েছে খালেদ মোশাররফের পদোন্নতির আদেশ।
ট্যাংক নিয়ে রাজপথে নামা জওয়ানদের জনতার অভিনন্দন জানানোর একটি ছবি স্থান পায় সংবাদের প্রথম পাতায়। তার পাশে ছিল ‘রাজধানীর পথে পথে লাখো জনতার আনন্দ মিছিল’ শিরোনামের দুই কলামের প্রতিবেদন।
আগের দিন সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল, এমন একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে আহমদুল কবির সম্পাদিত সংবাদ।
সেদিন সংবাদের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল- ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর অগ্রনায়ক জিয়াউর রহমান জাতির এক সংকট সময়ে এগিয়ে এসেছেন। অনিশ্চয়তা ও দিশেহারা জাতির জীবনে সঠিক পথনির্দেশের সুস্থ ও সুস্পষ্ট কর্মধারার ভিত্তি রচনার সুকঠিন ও মহান দায়িত্ব পালনে তার সময়োচিত প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা জাতিকে সংকটট উত্তরণে পথনির্দেশ দিয়েছে।’
ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজার্ভারের প্রধান শিরোনাম ছিল- রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েছেন। শিরোনামের শোল্ডার ছিল- তিন বাহিনীর প্রধানরা উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসিন নিযুক্ত।
অবজার্ভারের ডান পাশে রাষ্ট্রপতি সায়েম ও বিদায়ী রাষ্ট্রপতির আলাপের দুই কলামের একটি ছবি ছিল। ডান পাশে ছিল জিয়াসহ বিমান ও নৌবাহিনী প্রধানের তিন কলামের ছবি।
ইংরেজি দৈনিকটির প্রধান প্রতিবেদনের নিচে বাম পাশে ছিল মোশতাকের বক্তব্য নিয়ে একটি দুই কলামের খবর। তার নিচে ছিল মোশতাকের বঙ্গভবন ছাড়ার খবর। প্রধান প্রতিবেদনের ডান পাশে ছিল স্বাভাবিক কাজ করে যেতে জনগণকে জিয়ার আহ্বান শিরোনামের একটি খবর।
রাজপথে জনতার উল্লাস, জওয়ানদের প্রশস্তি নিয়ে তিন কলামের একটি প্রতিবেদনের পাশে এক কলামের একটি খবর ছিল, যার শিরোনাম- ‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে কারফিউ’।
রাজথে জনতার উল্লাসের একটি ছবিও ছাপা হয়েছিল ওবায়দুল হক সম্পাদিত অবজার্ভারের প্রথম পাতায়। পত্রিকাটির শেষ পাতাজুড়ে ছিল আগের দিনের ঢাকার আটটি ছবি। সেখানে জওয়ান ও জনতার উল্লাসের পাশাপাশি মসজিদে নামাজ আদায় এবং বাজারে মাছ বিক্রির একটি ছবিও স্থান পায়।
বহুল আলোচিত সেই ৭ নভেম্বরই জিয়ার রাজনৈতিক অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল। এরপর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন, গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতির পদ। তারপর রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন।
বিএনপি দিনটি পালন করে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। অন্যদিকে তাহেরের দল জাসদ পালন করে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে। আর বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাছে এটি মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস।
একটি দিন এতভাবে পালনের নজির বাংলাদেশে আর নেই।






