ছয় দফা না মানলে এক দফা

চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির—ছবি : আগামীর সময়
ছয় দফা দাবি আদায় না হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পতনের আন্দোলন সফল করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ও জাতীয় সংসদে আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে আন্দোলন আরও কঠোর করা হবে।’
ছয় দফা দাবি আদায়ের কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চ শুরু করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে পথসভা করে রাত সোয়া ৮টার দিকে লং মার্চের গাড়িবহর চট্টগ্রামে পৌঁছায়। পরে লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী সমাবেশ।
শাপলা চত্বরের উদ্বোধনী সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা জনগণের জন্য রাস্তায় নেমেছি, জনগণের অধিকার আদায় করে ঘরে ফিরব ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেছেন, জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে পথসভায় তিনি আরও বলেছেন, ছয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়েছে। দাবি মানা না হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পতনের আন্দোলন সফল করে ঘরে ফিরবেন তারা।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, ২০২৪ সালের চার্টার ও জুলাইয়ের দাবি বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি তেল ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধের দাবিও সামনে এনেছেন জোটের নেতারা।
পথে পথে সরকারের সমালোচনা
শাপলা চত্বর থেকে যাত্রা শুরুর পর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় প্রথম পথসভা হয়। সেখানে শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, ২০২৪ সালের চার্টার বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের দাবি পূরণ এবং মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১১ দল মাঠে নেমেছে। জনগণকে এই আন্দোলনে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের পথসভায় দেশের মানুষ বর্তমান সরকারের কাছ থেকে মুক্তি চায় বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমির। নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করেনি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ সময় কুমিল্লা বিভাগ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেছেন, এ নিয়ে আর ‘ধানাই-পানাই’ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বৃহত্তর নোয়াখালীও বিভাগ দাবি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, আগে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন করেন তিনি।
পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তান, পরিবার-পরিজন ও স্বজনের অনেকে দুর্নীতি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। তার দাবি, গত ছয় মাসে সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন হয়নি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দিন যত যাচ্ছে, মানুষের জীবন তত দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে জাতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার ভঙ্গ করেছে অভিযোগ করে তিনি সংসদে ভুল স্বীকার করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, আবার মানুষকে কথাও বলতে দিচ্ছে না। দেশের মানুষ যেভাবে ক্ষমতায় বসাতে পারে, সেভাবেই ক্ষমতা থেকে উৎখাতও করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশ কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে জনগণকে বলা হয়েছিল নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। অনেক মানুষ তিনবেলা খাবারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত বলে দাবি করেন তিনি।
ফেনী-মিরসরাইয়ে আরও কঠোর বার্তা
বিকালে ফেনীর মহিপালে পথসভায় শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশবাসী ভালো নেই। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সরকারের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও জুলাই গণহত্যার বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
তিনি বলেছেন, প্রথম দিন থেকেই সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বাংলাদেশ ছাড়া তাদের আর কোনো ঠিকানা নেই উল্লেখ করে তিনি বললেন, তাদের ওপর অত্যাচারের ‘স্টিম রোলার’ চালানো হলেও তারা অন্য কোথাও চলে যায়নি।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, বিএনপি রাজপথে এবং নির্বাচনের আগে তাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা রক্ষা না হলে সারা দেশে আবার যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে। তবে তারা আর কোনো যুদ্ধ চান না উল্লেখ করে সরকারকে প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সন্ধ্যায় মিরসরাইয়ের পথসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ক্ষমতায় আসার আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন সেটি অস্বীকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
চট্টগ্রামে সমাপনী সমাবেশ
লালদীঘি ময়দানের সমাপনী সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে সীতাকুণ্ড পৌর সদরে আরেকটি পথসভা হয়। পরে রাত সোয়া ৮টার দিকে লং মার্চের গাড়িবহর চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। সমাপনী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সমাবেশে এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে বলেছেন, বিরোধী দলের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ নেই। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে ছয় মাসে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। দায় চাপানোর রাজনীতি মানুষ আর গ্রহণ করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেছেন, ১১ দলের ছয় দফার একটিও তাদের নিজস্ব দাবি নয়; সবই জনগণের দাবি। আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আপনারা অন্যায় করবেন আর বিরোধী দল আঙুল তুলবে না, তা হবে না।’
গণভোটের গণরায় অস্বীকার করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জনগণের ৭০ শতাংশের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে জানিয়ে তিনি বলেছেন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসছে এবং সেই ডাকে জনগণ সাড়া দেবে।
সমাপনী সমাবেশে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, অতীতে অনেক সরকার এসেছে। কিন্তু এখন মানুষের মুখে মুখে সরকার আর টিকবে না— এমন কথা শোনা যাচ্ছে। জনগণের দাবি মেনে না নিলে সরকার টিকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যানজটে ভোগান্তি
এদিকে লং মার্চ ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের ধীরগতি ও যানজট সৃষ্টি হয়। কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় পথসভাকে কেন্দ্র করে ঢাকামুখী লেনে যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। অন্যদিকে, চট্টগ্রামমুখী লেনে লং মার্চের বিশাল গাড়িবহরের কারণে থেমে থেমে যানজট দেখা দেয়।











