ছাত্রদলই এগিয়ে নিচ্ছে বিএনপিকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় ছাত্ররাজনীতির অগ্রভাগে থাকা নেতারাই এখন ধীরে ধীরে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে দলের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন ছাত্রদলের সাবেক নেতারা। ফলে একসময়কার ছাত্রনেতৃত্বই হয়ে উঠছে বিএনপির চালিকাশক্তি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সব স্তরে তাদের উপস্থিতি এখন বেশ জ্বলজ্বলে। দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা লক্ষণীয়। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক নেতারা। তাদের কয়েকজন বর্তমান সংসদের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রিসভায়ও।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘তারুণ্যের প্রতীক’ হিসেবে দেখা হয় দলটিতে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বর্তমানে তারেক রহমান যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন বিএনপির অনেকেই বলছেন— গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে ম্যাচ করে, এমন একটি নেতৃত্ব তিনি নিজেই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করতে চান— বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও যার প্রতিফলন ঘটেছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ছাত্রদলের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শীর্ষ পদ অর্থাৎ সভাপতি/আহ্বায়ক এবং সাধারণ সম্পাদক/যুগ্ম আহ্বায়কদের মধ্যে ১৪ জন এমপি হয়েছেন। আর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী হয়েছেন ছয়জন। তাদের মধ্যে বর্তমান সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংগঠনের সাবেক চার কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আর শীর্ষ পদধারী ৯ জন সাবেক ছাত্রদল নেতা রয়েছেন বর্তমান সংসদে।
১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে দলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। এর কয়েক বছর পর নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ই সামনে চলে আসে সংগঠনটির ভূমিকা। ওই আন্দোলন থেকেই মূলত রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ছাত্রদল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৯০ সালে ২৪টি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। ডাকসুর ভিপি হিসেবে তখন ছাত্রদল সভাপতি আমানউল্লাহ আমান ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক। এই ছাত্র ঐক্যই এরশাদবিরোধী আন্দোলন বেগবান এবং চূড়ান্তভাবে তার পতনকে ত্বরান্বিত করে। আমানের সঙ্গে তখন খায়রুল কবির খোকন ডাকসুর জিএস এবং নাজিম উদ্দীন আলম এজিএস ছিলেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে ডাকসুর নেতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে জাতীয় নেতৃত্বে উত্তরণ হয় তাদের।
অন্যদিকে ১৯৮২ সালে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘জাতীয় নেত্রী’ হিসেবে ভূমিকা শুরু হয় খালেদা জিয়ার। সেখানে তার সঙ্গে থাকা ছাত্রদল নেতারাই তখন বিএনপি নেত্রীর অন্যতম সহায়কশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল বলে অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমান প্রথমবারের মতো বিএনপির এমপি নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রীও হন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি আবার সরকার গঠন করলে আমানকে আবারও প্রতিমন্ত্রী করা হয়। এ ছাড়া খায়রুল কবির খোকন এবং নাজিম উদ্দীন আলমও পরে এমপি হন। আমানউল্লাহ এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এবং নাজিম উদ্দীন আলম দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে রয়েছেন। অন্যদিকে খায়রুল কবির খোকন দলটির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেরও সদস্য।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ধীরে ধীরে বিএনপির নেতৃত্বে ছাত্রদলের উত্থান লক্ষ্য করা যায়। আমান, খোকন, আলম ছাড়াও শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল কবির রিজভী, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ অনেকেই ছাত্রদলের রাজনীতি করে বিএনপির মূলধারায় এসেছেন। বিএনপির প্রথম ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। যিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিএনপি সরকারে মন্ত্রীও ছিলেন। বর্তমানে দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই সদস্য।
দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে এখন সরাসরি ছাত্রদল করা নেতা রয়েছেন চারজন। তারা হলেন— সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী ও আমানউল্লাহ আমান। সালাহউদ্দিন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, রিজভী কেন্দ্রীয় সভাপতি, আমান কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক এবং ডা. জাহিদ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের নেতা ছিলেন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটি ছাড়াও নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদ, যুগ্ম মহাসচিবসহ দলের সব স্তরে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা রয়েছেন। শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেই নয়, তৃণমূল পর্যায়েও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের প্রভাব বাড়ছে দলটিতে।
দুদকের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন কারাবন্দি হন, তখন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন তারেক রহমান। তিনি দায়িত্বে আসার পর থেকেই ছাত্র নেতাদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষ পদধারীসহ সংগঠনটির অন্যান্য পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্তত ২৫-৩০ জনকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তাদের মধ্যে অন্তত ২১ জন বিজয়ী হয়ে সংসদে গেছেন।
শীর্ষ পদধারী নেতাদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে ঢাকা-২ আসন থেকে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আমানউল্লাহ আমান, গাজীপুর-৫ আসনে সংগঠনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মিলন, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে সাবেক সভাপতি শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পটুয়াখালী-৪ থেকে সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, খুলনা-৪ থেকে সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল, টাঙ্গাইল-৫ আসনে সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম, ঢাকা-৯ আসনে সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব এবং বরিশাল-৪ থেকে সাবেক সভাপতি রাজীব আহসান বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে এ্যানি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। টুকু হয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। হাবিবুর রশিদ সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রাজীব আহসান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদের বাইরে সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ, নরসিংদী-১ থেকে খায়রুল কবির খোকন, পঞ্চগড়-২ থেকে ফরহাদ হোসেন আজাদ, খুলনা-৩ থেকে রকিবুল ইসলাম বকুল, ভোলা-৪ থেকে নূরুল ইসলাম নয়ন, মুন্সীগঞ্জ-৩ থেকে কামরুজ্জামান রতন, ফরিদপুর-৪ থেকে শহীদুল ইসলাম বাবুল, গোপালগঞ্জ-১ থেকে সেলিমুজ্জামান সেলিম, মাদারীপুর-৩ থেকে আনিছুর রহমান তালুকদার খোকন, শরীয়তপুর-৩ থেকে মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এবং লক্ষ্মীপুর-২ থেকে আবুল খায়ের ভূঁইয়া নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। এ ছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে ডা. জাহিদ হোসেন দিনাজপুর-৬ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
তাদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডা. জাহিদ হোসেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী, ফরহাদ হোসেন আজাদ পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং রকিবুল ইসলাম বকুল ও নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু জাতীয় সংসদের হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রুহুল কবির রিজভীকে করা হয়েছে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা। পাশাপাশি গত ২০ আগস্ট রিজভীকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বও দেওয়া হয়।
এদিকে ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনেও গুরুত্ব পেয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীরা। ৩৬ জনের মধ্যে অন্তত ১৩ জন মহিলা এমপি হয়েছেন, যারা সরাসরি ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা। তাদের মধ্যে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুজন নেত্রীও রয়েছেন। রাকিব-নাছির কমিটির সেই দুজন যুগ্ম সম্পাদক হলেন মানসুরা আক্তার ও সানজিদা ইসলাম তুলি। অন্যরা হলেন— শিরীন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা উর্মি ও সেলিনা সুলতানা নিশীতা।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সাবেক ছাত্রনেতারা আগামী দিনে জাতীয় নেতৃত্বে ভূমিকা পালন করবে— এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু আমরা সরকারে আছি, সরকারেও তারা দায়িত্ব পালন করবে। এটা অতীতেও হয়ে এসেছে, এখনো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে।’
‘কিছু নেতা সরকারে থাকবে, কিছু দলে থাকবে। সবাই তো আর সরকারে জায়গা পাবে না, দলও তো পরিচালনা করতে হবে। বিএনপির হাইকমান্ড ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের যখন যেখানে যে দায়িত্ব দেবেন, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তারা সে দায়িত্ব পালন করবে’— যোগ করলেন ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতি।







