এআই বিভাজন দূর করতে সক্ষমতা, প্রবেশাধিকার ও ডিজিটাল ভিত্তি জোরদার করতে হবে

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতিসংঘ গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স -এ লেখক এ এইচ এম বজলুর রহমান
৬-৭ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতিসংঘ গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স -এ অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান। তিনি বাংলাদেশে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডরও। জাতিসংঘের ওই সম্মেলনে তার বক্তব্যের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো-
সম্মানিত কো-চেয়ারবৃন্দ, এক্সেলেন্সিস এবং সহকর্মীরা,
আজ সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শুরু করতে চাই।
এবং আমি একটি সহজ প্রশ্ন রাখতে চাই:
কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে দক্ষতা, বিশ্বস্ত তথ্য, সুরক্ষাব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পৌঁছানোর আগেই যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৌঁছে যায়, তখন কী ঘটে?
ডিজিটাল বিভাজন তখন বিলীন হয় না।
বরং সেটিই এআই বিভাজনে রূপ নেয়।
আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এমন একটি দেশ, যেখানে লাখ লাখ মানুষ গ্রামীণ, উপকূলীয়, নিম্ন আয়ের এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে বসবাস করেন।
তাঁদের কাছে এআই বিভাজন কেবল সংযোগ সুবিধা কিংবা কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রশ্ন নয়।
এটি ভাষার বিভাজন।
ডেটার বিভাজন।
দক্ষতার বিভাজন।
বিশ্বস্ত তথ্যের বিভাজন।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিভাজন।
এবং ক্ষমতার বিভাজন।
এটি এআইকে বোঝার ক্ষমতা।
এআইকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
এবং এআই কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা।
সমস্যা হলো, এআই সক্ষমতা উন্নয়নের অনেক উদ্যোগ এখনো উন্নয়নশীল দেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে মূলত প্রযুক্তির ব্যবহারকারী বা ভোক্তা হিসেবে দেখে।
কিন্তু আমাদের আকাঙ্ক্ষা আরও বড় হতে হবে। দেশ ও জনগোষ্ঠীর এমন সক্ষমতা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের অগ্রাধিকার ও বাস্তবতার আলোকে এআই প্রযুক্তি উন্নয়ন, অভিযোজন, মূল্যায়ন, শাসন এবং যৌথভাবে নির্মাণ করতে পারে।
আমরা অ্যালগরিদমে বিপুল বিনিয়োগ করছি।ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করছি।উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছি।কিন্তু যে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানুষ ইতিমধ্যে চেনে এবং বিশ্বাস করে, সেগুলোতে কি আমরা সমানভাবে বিনিয়োগ করছি? এআই-নির্মিত ডিপফেকের শিকার একজন গ্রামীণ নারী হয়তো জানেন না, সহায়তার জন্য কোথায় যেতে হবে। সিনথেটিক বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের মুখোমুখি একজন কমিউনিটি সাংবাদিকের কাছে হয়তো তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ নেই।স্থানীয় ভাষা ও উপভাষা হয়তো ডেটাসেটেই অনুপস্থিত।
নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হয়তো এআই শাসনব্যবস্থার আলোচনাতেই অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছেন।
এটাই প্রকৃত এআই সক্ষমতার ঘাটতি। এটি শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবধান নয়।এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবধান।একটি ভাষাগত ব্যবধান।একটি অর্থায়নের ব্যবধান।এবং শেষ পর্যন্ত, এটি ক্ষমতার ব্যবধান।
তাই কো-চেয়ারদের সারসংক্ষেপ এবং ২০২৭ সালের এআই ডায়ালগের ধারাবাহিকতার জন্য আমি তিনটি সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার প্রস্তাব করছি।
প্রথমত, স্থানীয় ভিত্তির ওপর এআই সক্ষমতার ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে
কমিউনিটি মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, নারী সংগঠন, যুব নেটওয়ার্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় ও বৈশ্বিক এআই সক্ষমতা উন্নয়ন কৌশলের অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশে কমিউনিটি মিডিয়া ইতিমধ্যে স্থানীয় ভাষা ও উপভাষায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং প্রযুক্তিবিষয়ক আলোচনায় প্রায়ই অনুপস্থিত থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে।কমিউনিটি মিডিয়াকে এআই সাক্ষরতা, তথ্যের অখণ্ডতা রক্ষা, এআই-সংশ্লিষ্ট ক্ষতি আগাম শনাক্তকরণ এবং অর্থবহ জনঅংশগ্রহণের স্থানীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে
নিজেদের ভাষায় যদি শত শত কোটি মানুষ ডিজিটালভাবে অদৃশ্য থেকে যান, তাহলে এআইকে প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক বলা যাবে না।আমাদের প্রয়োজন বহুভাষিক ডেটাসেট, স্থানীয় দক্ষতা, স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই প্রয়োগ এবং ডেটা গভর্ন্যান্স ও প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণে গ্লোবাল সাউথের অর্থবহ অংশগ্রহণ।
তৃতীয়ত, টেকসই ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে
স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পচক্রের ওপর নির্ভর করে সক্ষমতা উন্নয়ন টিকে থাকতে পারে না।সম্পদস্বল্প জনগোষ্ঠীর হাতে নতুন এআই-সংক্রান্ত দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় সম্পদ না দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমি গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি ‘এআই ক্যাপাসিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব করছি।এই তহবিলে কমিউনিটি মিডিয়া ও কমিউনিটিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি পৃথক অর্থায়ন উইন্ডো থাকা উচিত। এই তহবিলের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় এআই সাক্ষরতা, সিনথেটিক কনটেন্ট যাচাই, প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, জনস্বার্থভিত্তিক এআই এবং এআই শাসনব্যবস্থায় অর্থবহ অংশগ্রহণে সহায়তা দেওয়া উচিত।
আমার বার্তা খুবই সরল: সক্ষমতা ছাড়া প্রবেশাধিকার নির্ভরশীলতা তৈরি করে।স্থানীয় মালিকানা ছাড়া সক্ষমতা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পচক্রের পর টিকে থাকে না।এবং ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক অংশগ্রহণ ছাড়া এআই শাসনব্যবস্থা সেই বিভাজনগুলোকেই আবার সৃষ্টি করবে, যেগুলো দূর করতে আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি।
এআই কেবল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছালেই হবে না।এআইকে রূপ দেওয়ার জন্য জনগোষ্ঠীর হাতে জ্ঞান, প্রতিষ্ঠান, সম্পদ এবং ক্ষমতা থাকতে হবে।




