এই কী মানবজন্ম!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিড়বিড় করে কী যেন বলছে সামিয়া। সামান্য একটু ছটফট করছে আর কী যেন বলছে কাতরে কাতরে।
কথাগুলো ওর মাও মনে হয় শুনতে পাচ্ছিলেন না। মাথাটা নিচু করে একটু কান পাততে শোনা গেল, সামিয়া কাতরাচ্ছে—পানি, পানি খাব।
সামিয়ার নাকে অক্সিজেনের নল, মাথায় স্যালাইনের সুচ ঢোকানো; স্যালাইন চলছে। শরীরের ওপর একটা ছোট্ট কাঁথা; হয়তো নানি রাত জেগে সেলাই করেছিলেন। আড়াই বছর বয়সী মেয়েটার নড়াচড়ার উপায় নেই। সে মনে হয় নড়তে চায়ও না। তার একটাই চাওয়া— একটু পানি খাবে।
সামিয়ার মা কথাটা বুঝতে পেরে আশপাশে সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আমার মা পানি চাচ্ছে, পানি দেওয়া যাবে? পানি দেওয়া যাবে?’
নার্স এসে পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। সামিয়ার বাবা উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটছেন। ডাক্তার দৌড়ে এসে বললেন, নিতে হবে আইসিইউতে; লাগবে হাই ফ্লো অক্সিজেন। এই ওয়ার্ডের সঙ্গেই আইসিইউ। কিন্তু মনে হচ্ছে, লাখ মাইল দূরের ব্যাপার। কারণ, বেড ফাঁকা নেই আইসিইউতে।
সামিয়ার স্বজনরা আশা ছাড়ছেন না। একটু পরেই ফাঁকা হবে একটা বেড। কারণ, একটা বাচ্চার মা-বাবার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। বাচ্চাটা মনে হয় সামিয়ার জন্য আইসিইউ বেড ছেড়ে চেনাজানা এই জগৎ ছেড়ে চলে গেছে। সামিয়ার স্বজনরা অস্থির হয়ে আইসিইউর দরজায় কথা বলছেন—ওই বেডটা সামিয়ার জন্য ম্যানেজ করা যায় কিনা।
এ পাশে জগতের অভিমানে আইসিইউ বেড ছেড়ে চলে যাওয়া বাচ্চাটার মা-বাবা চিৎকার করছেন; ও পাশে সামিয়ার বাবার চোখে একটু স্বস্তি— যাক, পাওয়া গেছে একটা বেড। মা সামিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে একটু পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন আর চিৎকার করছেন, ‘আমার মা পানি খাইতে চায়!’
অতিনাটকীয় এই বর্ণনাকে আপনার কাছে ফ্রান্সের সেই প্লেগ বা এই কদিন আগের করোনা মহামারীর সময়ের কোনো দৃশ্যকল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের অতিচেনা হামের প্রকোপের এই দৃশ্য মাস কয়েক ধরে নিয়মিত হয়ে গেছে শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে।
অবশ্যই দৃশ্যটা কেবল শিশু হাসপাতালের নয়; এ মুহূর্তে সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশের কমপক্ষে ৫৮ জেলায় শত শত হাসপাতালে কমপক্ষে ৬০ হাজার শিশু হাম ও হামজনিত শ্বাসকষ্টে জীবনের সঙ্গে লড়াই করছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চারশ দেবদূত আমাদের অভিশাপ দিয়ে এই হামে আক্রান্ত হয়ে চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে। নিশ্চিত থাকতে পারেন, রেকর্ডের খাতায় নাম না থাকা শিশুর সংখ্যাটা এর কয়েক গুণ। হাম নামে গত কয়েক দশকের নিরীহ রোগটা এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শেষ করে দিতে উদ্যত হয়েছে।
শত শত বাচ্চা এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। কেউ অক্সিজেনের অভাবে কাতরাচ্ছে, কেউ ছটফট করছে প্রবল শ্বাসকষ্টে। কেউ বলছে, ‘পানি খাব, পানি খাব।’
শিশু হাসপাতালের বিছানাগুলোতে তখনো সকালের আলো এসে পড়েনি। তার আগেই ২ নম্বর ওয়ার্ডটা, মানে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে সবকটি বাচ্চার ঘুম ভেঙে গেছে। আসলে ওরা ঘুমায়ইনি সারারাত। কেউ শ্বাসকষ্ট, কেউ শরীরের ব্যথা আর কেউ জলতেষ্টায় ছটফট করেছে সারারাত। কারও কারও বিছানায় ক্লান্ত হয়ে মা ঘুমিয়ে পড়েছেন; বাচ্চাটা চেষ্টা করছে নাকের অক্সিজেন নল টেনে ফেলে দেওয়ার।
বেশিরভাগ বাচ্চার বয়স দুই বছরের কম। তিন-চার মাস বয়সী বাচ্চাও আছে। ওরা বুঝতেই পারছে না, কেন এসব যন্ত্রপাতি আর স্যালাইন-অক্সিজেনের নল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ওদের!
ফরিদপুর থেকে যেমন ইয়াসমিনকে নিয়ে এসেছেন তার মা-বাবা, নানা-নানি। আজকে দুই মাস ধরে ইয়াসমিনকে নিয়ে ছোটাছুটি করছেন সবাই। ইয়াসমিনের হাম হয়েছিল। মাস দুয়েক আগে সেরেও গেছে সেই হাম। অন্তত গায়ে আর হামের কোনো গোটা নেই। কিন্তু ইয়াসমিন ঠিকমতো শ্বাসই নিতে পারে না। সবসময় শ্বাসকষ্ট হয়; অক্সিজেন না দিলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। ইয়াসমিনের জায়গা হয়েছে এইচডিইউতে। সেখানে তাকে রাখা হয়েছে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে।
কবে ইয়াসমিন আবার সাধারণ বেডে আসতে পারবে— এটাই এখন পরিবারের অপেক্ষা। ইয়াসমিনকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে কবে, এই চিন্তা তারা মাথায়ও আনতে পারছেন না। তাদের চিন্তা, আগে বাচ্চাটা এইচডিইউ থেকে বের হয়ে সাধারণ বেডে আসুক। সুস্থতার চেয়ে প্রাণের মূল্য অনেক বেশি। বাবাটা হাসপাতালে থাকুক, বন্দি থাকুক; তাও বেঁচে থাকুক।
ধামরাইয়ের গার্মেন্টকর্মী জাহাঙ্গীর তার ছেলের এই বেঁচে থাকার চেষ্টায় ঠিক তিনটি মাস ধরে হাসপাতালের দুয়ারে ছুটছেন। আড়াই মাস ধরে জাহাঙ্গীর এই হাম ওয়ার্ডের আইসিইউর সামনেই আছেন। চাকরিটা চলে গেছে; বউয়ের গয়না, একটুকরো জমি— সব বিক্রি করে ফেলেছেন। ৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন আর শিশু হাসপাতালের বিপরীতে গণহোটেলে থাকারও উপায় নেই।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী চব্বিশটা ঘণ্টা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে এইচডিইউতে থাকেন। জাহাঙ্গীর আর তার ভাই সারাটা দিন এই কাচের দরজার এপাশে বসে-দাঁড়িয়ে থাকেন। নার্স কোনো প্রেসক্রিপশন দিলে ছুটে সেই ওষুধ বা স্যালাইন নিয়ে আসেন। বাকিটা সময় আল্লাহকে ডাকেন। রাত হলে হাসপাতালের খোলা চত্বরে একটা মাদুর পেতে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। ঘুম আসে না; আবার চলে আসেন এখানে— যদি বাবাটার কোনো ওষুধ লাগে!
শিশু হাসপাতালে ঘোষিতভাবে একটি ওয়ার্ড হামের জন্য বিশেষায়িত করা হয়েছে। তাতে কুলাচ্ছে না। ৯ নম্বর ওয়ার্ডটিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য। দরজায় ক্লান্তমুখে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মী সর্বস্ব হারানোর ভঙ্গিতে বলেন, ‘স্যার, এতেও মনে হয় কুলাইব না; ডেঙ্গু ওয়ার্ডও মনে হয় লাগবে। আর সওন যায় না।’
কে সইতে পারে? এই জগতের পাপ, অন্যায়, জটিলতা যাদের স্পর্শ করেনি; সেই শিশুগুলোর এই লড়াইটা কোন মানবসন্তান সইতে পারে? নাফিসার বড় দাদি চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমরা মাইনসের বাচ্চা না; মাইনসের বাচ্চা কি ছাওপোনার কষ্ট সহ্য করতে পারে?’
মাদারীপুরের নাফিসা বড় ভাগ্য করে এসেছিল দুনিয়ায়। তার মায়ের দাদি দিব্যি তরুণীদের মতো সমর্থ মানুষ। সবাই মজা করত, নাফিসা আর তার বড় দাদি একসঙ্গে বেড়াতে বের হবে। কিন্তু নাফিসা তো হাঁটতে শেখার আগেই আটকে গেছে অক্সিজেনের পাইপে।
যদিও মাদারীপুর, ফরিদপুর অঞ্চলের রোগী বেশি চোখে পড়ল। নানা ঘাটে ঘুরে এরা থিতু হয়েছেন শিশু হাসপাতালে। সাভার-ধামরাই থেকেও বেশ বাচ্চা এসেছে। এমনকি কুড়িগ্রাম থেকেও শরিফ এসেছে এখানে। শরিফের কী ভাগ্য! সে এসেছিল ভাঙা পায়ের অপারেশন করাতে; এখানে এসে হামে আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে। শরিফের মতো ১২-১৩ বছর বয়সী কয়েকটি বাচ্চার দেখা মিলল। এদের পরিবার ভয়ানক অনুতাপের সঙ্গে জানাল, টিকা দেয়নি কখনো।
বেশিরভাগ বাচ্চার টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি। সমাজে যেহেতু টিকাহীন একটা প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে রোগটা; সবচেয়ে বেশি ভুগছে টিকার বয়স না হওয়া শিশুরাই। ওদের যারা রক্ষা করবে, সেই বছর দুয়েক বয়সীরাই তো টিকার অভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
টিকার অভাব হলো কেন?
আইসিইউর সামনে দুই মাস বসে থাকতে থাকতে মাথায় রক্ত উঠে গেল জাহাঙ্গীরের, ‘বোঝেন না? বোঝেন না কেন টিকার অভাব হইল? আটবার টিকাকেন্দ্রে গেছি। সব টিকা পাইছি; হামের টিকা দেয় নাই। ভিটামিন-এ দেয় নাই। আপনেরা কিছু বোঝেন না? শুধু কান্দনের নাটক করেন?’
নাহ। চোখের জলটা আসলেই বড্ড নাটুকে লাগছে। আইসিইউতে মনে হয় আরেকটা বেড ফাঁকা হবে। বুকফাটা চিৎকার শোনা যাচ্ছে, ডাক্তারদের অসহায় দৌড়াদৌড়ি চলছে। আমাদের এই নাটুকে চোখের পানি এবং ফাঁকা সেমিনারের বুলি এখানে কোনো কাজে আসছে না।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, লেখক ও সাংবাদিক




