রেকর্ড বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ : সক্ষমতার বার্তা, তবে আত্মতুষ্টির নয়

ছবি : এআই
বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪.১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের সক্ষমতার জোরালো বার্তা দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী, বহুপাক্ষিক ঋণদাতা ও দ্বিপাক্ষিক অংশীদারদের কাছে নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের এই চিত্র দেশের আর্থিক দায়বদ্ধতা, নীতিগত শৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক।
বৈশ্বিক অর্থনীতির নানামুখী অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হারের প্রবণতা এবং ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট তীব্র চাপের মধ্যেও এ ধরনের ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধ নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অনড় ও সফল।
সাধারণত ঋণ নেওয়া নিজেই কোনো মৌলিক সমস্যা নয়, বরং ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সময়মতো তা পরিশোধের সক্ষমতাই একটি দেশের অর্থনৈতিক পরিপক্বতা নির্দেশ করে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক ঋণ ব্যবহার করে আসছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, মেট্রোরেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে এই বিনিয়োগ দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি এনেছে। তাই নির্ধারিত সময়ে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে এই বার্তাই দিতে সক্ষম হয়েছে যে, বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ গন্তব্য।
তবে এই বিশাল অর্জনের মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের মুদ্রার অপর পিঠের বাস্তবতাও গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক পতনমুখী চাপ, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করা একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতের জন্য গভীর সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটিকে কোনোভাবেই আত্মতুষ্টির কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং সতর্ক পরিকল্পনার সূচনা হিসেবে ধরা উচিত।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। বর্তমানে আমাদের রপ্তানি খাত মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। এই একক নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া এবং জাহাজ নির্মাণসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহকে আরও গতিশীল ও উৎসাহিত করা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণ করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কারণ ঋণ পরিশোধের আসল ও টেকসই শক্তি আসে একটি গতিশীল, বৈচিত্র্যময় ও স্বনির্ভর উৎপাদনশীল অর্থনীতি থেকে, কেবল নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করার মাধ্যমে নয়।
আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশকে আরও বেশি পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো রেয়াতি সুবিধা বা স্বল্পসুদী দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। এর পরিবর্তে তুলনামূলক কঠিন শর্তের এবং উচ্চ ব্যয়ের বাণিজ্যিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণতা, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা যাচাই করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অনুৎপাদনশীল খাতে যেন কোনোভাবেই ঋণের টাকা অপচয় না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
মূলত একটি দেশের অর্থনীতির আসল শক্তি কেবল মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করা যায় না। আর্থিক দায়বদ্ধতা, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়নের সমন্বিত চিত্রই একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় অর্জন, তবে এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য বা সংকটের অবসান হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং এই অর্জনকে ভিত্তি করে এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে আমলে নিয়ে আরও টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের প্রধান কৌশল।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক আর্থিক দায়বদ্ধতা পালনে দেশটি অনড় ও সক্ষম। এখন সময়ের দাবি হলো এই সক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করা। ঋণ যেন কেবল সঠিক সময়ে পরিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সেই ঋণের অর্থে গড়ে ওঠা প্রতিটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির মজবুত ভিত্তি রচনা করে। তবেই আজকের এই সফল ঋণ পরিশোধ আগামী দিনের একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির প্রকৃত সোপান হয়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
masarker@bau.edu.bd




