যে ছবিটা তোলা থাকবে মনের ফ্রেমে...

অসুস্থ জুরাইসের পাশে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মা, যে ছবি এখন অতীত। ছবি: আগামীর সময়
বৃহস্পতিবার দুপুর। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। জেনারেল ওয়ার্ডে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল এক বেডে। ছোট্ট একটি শিশুর হাতের ক্যানোলা এবং মুখে অক্সিজেন মাস্ক। পাশে বসা মায়ের চোখে-মুখে উদ্বেগ।
ফটোসাংবাদিক হিসেবে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করার ইচ্ছা দমানো গেল না। ক্যামেরাটা বের করার পরই ঘিরে ধরলেন অন্য রোগীর স্বজনরা। না, ছবি তুলতে বাধা দিতে নয়, তারা জানালেন জুরাইস নামের ছোট্ট রোগীটির চিকিৎসা সহায়তার আকুতি। বললেন, ‘আপনি সাংবাদিক মানুষ, যদি পারেন বাচ্চাটার একটু উপকার করেন। বাচ্চাটার অনেক কষ্ট হচ্ছে।’
তারা একটু সুস্থির হতে জানা গেল, জুরাইসের মা-বাবা পটুয়াখালী থেকে এসেছেন হামে আক্রান্ত চার মাসের ছেলেকে নিয়ে। এক মাসের বেশি সময় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে তারা প্রায় নিঃস্ব। এদিকে প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছে ছেলের অবস্থা। বাঁচিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে দিতে হবে পাঁচটি ইনজেকশন, যার প্রতিটির দাম ১৭ হাজার টাকা। নিতে হবে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। অথচ একটি ইনজেকশন কেনারই সামর্থ্য নেই রিকশাচালক বাবা সাইফুলের। ছেলেকে বাঁচাতে পারবেন কি না— সেই সংশয় আর শঙ্কায় দিশাহারা সাইফুল ও তার স্ত্রী লামিয়া।
তাদের অসহায়ত্ব দেখে জুরাইসের তুলতুলে হাতের ক্যানোলার সুচ যেন আমার বুকেও বিঁধল। অফিসের এক সিনিয়র সহকর্মীকে ফোনে জানালাম। তিনিও বললেন, জুরাইসের জন্য আমাদের কিছু করতে হবে। আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন হাসপাতালেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার আরেক সহকর্মী পৌঁছালেন সেখানে। তাৎক্ষণিক কিছু আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা হলো। সহায়তার আবেদন করে জুরাইসের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ হলো আগামীর সময়-এর অনলাইন ভার্সনে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেশ ভালোই সাড়া পাওয়া গেল। জোগাড় হলো প্রায় ২২ হাজার টাকা।
গতকাল শুক্রবার সেই টাকা নিয়ে হাসপাতালে গিয়েই খেলাম ধাক্কা। যে বেডে জুরাইস ছিল, সেটি ফাঁকা! বুকের ভেতরটায় বেজে উঠল এক অশনি সুর। হামে যে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে, সেই মিছিলে কি জুরাইসও যুক্ত হলো!
অবশ্য পাশের বেডের রোগীর স্বজনরা জানালেন, অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় তাকে নেওয়া হয়েছে পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ছুটে গেলাম সেখানে। হাসপাতালে গিয়ে জানলাম একটি আইসিইউয়ের ব্যবস্থা হয়েছে তার জন্য। আমাকে দেখেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন সাইফুল-লামিয়া।
ছেলের জন্য আইসিইউ ব্যবস্থা করতে পারলেও তাদের কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ। সাইফুল বলছিলেন, ‘মহাখালীর হাসপাতালের ডাক্তার চার দিন আগেই আইসিইউতে ভর্তি করতে বলেছিলেন; কিন্তু টাকার অভাবে পারি নাই। অনেক ধারদেনা করেছি। চার দিন আগেই যদি আমার বাবাকে আইসিইউতে আনতে পারতাম, তাহলে অবস্থা এত খারাপ হতো না।’
বেসরকারি হাসপাতালটির চিকিৎসকরাও জানালেন জুরাইসের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা। অবশ্য সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা জানালেন তারা। চাইলেন দোয়াও।
দুপুরে ওই হাসপাতাল থেকে ফিরে মনে হচ্ছিল জুরাইসকে নিয়ে কিছু লেখা দরকার। দিনের অন্যান্য ব্যস্ততা সেরে রাতে যখন লেখাটি লিখতে বসেছি, এগিয়ে নিয়েছি অনেক দূর, তখন খবর এলো— জুরাইস আর নেই। অনেক অনেক ভালোবাসা আর মায়ার বাঁধনে বাঁধা যায়নি তাকে। হামে মারা যাওয়া শিশুদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে সেও।
রাত ১০টার দিকে জুরাইসের বাবা যখন ছেলে মৃত্যুর খবরটি শোনালেন, তখন কেন জানি স্বজন হারানোর বেদনা হয়েছে আমারও। চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা নোনা জলের ধারা মুছেছি সবার আড়ালে।
মাত্র চার মাসের শিশুটি হয়তো সুদূর পটুয়াখালীর মাটিতে চুপটি করে ঘুমাবে।
সময়ের পরিক্রমায় তার ছোট্ট শরীর মিশে যাবে মাটিতে। আমার ক্যামেরায় থাকা তার ছবিগুলোও হয়তো কোনো একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু মনের ফ্রেমে গত দুদিনে খোদাই হয়ে যাওয়া তার ছবিটি থেকে যাবে অবিনশ্বর হয়ে—সন্তানহারা কোনো বাবার আর্দ্র কণ্ঠস্বর হয়ে।








