মানবিকতার গুরুভার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উদ্বেগ শুধুই বাড়ছে। বছরের পর বছর কেটে গেলেও মিটছে না সংকট। গতকাল শনিবার ছিল বিশ্বের বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্মরণ করার দিন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এ মানবিক সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো মেলেনি। প্রায় এক দশক এ সংকটের বোঝা বইছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে মানবিকতাই এখন বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবেশও অনুকূলে নেই। সেখানে জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির প্রচণ্ড লড়াই চলছে। এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুল জনসংখ্যা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দিন গুনছে। মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার চরম অভাব এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংকটের গভীরতা বুঝতে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোয় সামান্য পরিসরে বাস করছে লাখ লাখ মানুষ। এখানকার জনঘনত্ব পৃথিবীর যেকোনো জনবহুল শহরের চেয়ে বেশি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের এ বসবাস এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। কুতুপালং আজ বিশ্বের বৃহত্তম মেগা ক্যাম্প। স্থানীয় অধিবাসীরা চরম সংকটে পড়েছেন। কক্সবাজারের স্থানীয় জনসংখ্যা যেখানে মাত্র পাঁচ লাখ, সেখানে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৫ লাখ। এই তীব্র ভারসাম্যহীনতা স্থানীয় মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতিও অপরিসীম। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি। ক্যাম্পগুলোতে মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ কারবার বাড়ছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে হত্যাকাণ্ড। কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন কর্মহীন ও শিক্ষাবঞ্চিত থাকার ফলে এই বিপুল জনগোষ্ঠী অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে। জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এর ওপর যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ঘাটতি। ইউক্রেন, গাজা কিংবা সুদানের যুদ্ধের কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন অন্যদিকে ঘুরে গেছে। ফলে এ ক্যাম্পগুলোর জন্য বরাদ্দ দিন দিন কমছে। প্রতি বেলা খাবারের জন্য বরাদ্দ এখন মাত্র ১৬ টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়ে একটি মানুষের পক্ষে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমারকে এ সংকটের সমাধানে বাধ্য করা যাবে না। বাংলাদেশ সরকার বিশ্বমঞ্চে বারবার জোরালো দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশ্বনেতাদের আশ্বাস কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
একটি দেশের পক্ষে চিরকাল এই বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা বয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়। এটি এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা নেই। এটি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য এক বিরাট হুমকি। বাংলাদেশ তার সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করেছে। এবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু ফাঁকা আলোচনা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক চাপ। আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেন সসম্মানে ও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, সে পথ অবিলম্বে সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় এ সংকটের আগুন একদিন পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে গ্রাস করতে পারে।




