মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের হাতছানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মিয়ানমার আমাদের অন্যতম প্রতিবেশী একটি দেশ। দেশটির সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। কিন্তু সে দেশটি এখন যেন অচ্ছুত; কূটনৈতিক সম্পর্ক যদিওবা পুরোদমে রয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটা শূন্যের কোঠায়। রোহিঙ্গা সমস্যা এ শীতল সম্পর্কের প্রধান কারণ। অথচ দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্যের সম্ভাবনা মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের।
সম্প্রতি দেখলাম মিয়ানমারের ঢাকার রাষ্ট্রদূত বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ওই রাষ্ট্রদূতের কাছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এলএনজি ও গ্যাস রপ্তানির জন্য প্রস্তাব করেছেন। বিষয়টিতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে তিনি মিয়ানমারে তার প্রতিপক্ষকে এ দেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং নিজেও সেখানে গিয়ে সরাসরি কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জ্বালানিমন্ত্রীর এ আগ্রহের কারণ বোধগম্য।
দেশে এখন তীব্র গ্যাসসংকট চলছে। গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিডিএফ)। কিন্তু সরবরাহ নেমে গেছে ২১৩৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, রপ্তানিমুখী শিল্প, পরিবহনব্যবস্থা ও গৃহস্থালি কাজকর্মসহ সর্বত্র। দেশে আবিষ্কৃত ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদের এরই মধ্যে ২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহার হয়ে গেছে। বাকি রয়েছে মাত্র ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের মতো। চরম সরবরাহ ঘাটতি পরিস্থিতির মধ্যে এখন প্রতি বছর গড়পড়তা ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্ঘটনায় পতিত এফএসআরইউ মেরামতের পর পূর্বাবস্থায় ফিরে এলেই যে জ্বালানি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, পরিস্থিতি এমন নয়। দেশকে ইস্পিত ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে উন্নীত করতে পর্যাপ্ত প্রাথমিক জ্বালানির লভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জানা যায়, মিয়ানমারে বর্তমানে ২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রমাণিত গ্যাস মজুদ রয়েছে। সেখান থেকে প্রতি বছর ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ রপ্তানি হয় থাইল্যান্ডে, ২৫ শতাংশ যায় চীনে আর বাকি ২৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। তাদের গভীর সমুদ্রে আরও বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিবেচনায় নিকট এই প্রতিবেশীর সঙ্গে জ্বালানি-বাণিজ্য নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, যাতে উভয়পক্ষ যুগপৎভাবে লাভবান হতে পারে।
শুধু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বিরাজমান বাণিজ্য সম্ভাবনার সুফল ভেস্তে যেতে পারে না। এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটলে উভয় দেশ নিজ নিজ সম্ভাবনার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। তাতে নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান বৈরিতার প্রশমন ঘটারও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে
বাংলাদেশ এখন এলএনজি আমদানির জন্য কাতারের দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। কিন্তু ইরান যুদ্ধে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি উদ্ধৃত করে তারা চুক্তিপত্রের ফোরস মেজোর (Force Majeure) ধারা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। দূরত্বের কারণে সেখান থেকে জ্বালানি আনতে কমপক্ষে সপ্তাহখানেক সময় লাগে। বিকল্প উৎস যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে আনতে সময় লাগে কমপক্ষে ১৫-৩০ দিন। এতে পরিবহন ও বীমা খরচও বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে মিয়ানমার থেকে এই জ্বালানি আনতে সময় লাগবে বড়জোর এক দিন। দামও তুলনামূলকভাবে কম পড়তে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে এটা যে কী রকম স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে আসে, সে অভিজ্ঞতার সাক্ষী আমি নিজে।
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাহাড়ি ঢলে সিলেটে অকাল বন্যায় দেশে বোরোর ভরা মৌসুমে খাদ্যশস্য অগ্নিমূল্য হয়ে পড়ে। মে মাসে বোরো সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করে ১০-১২ লাখ টন খাদ্যশস্য কিনে মজুদ করার জন্য সব গুদাম খালি করে রাখা হয়েছে। তখন জুন মাসে মজুদ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩০ লাখ টন চাল। প্রতি বছর এ সময়ে ওই রকম মজুদই রাখা হতো। কিন্তু ত্বরিতগতিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় ১০ লাখ টন তো দূরের কথা, আমরা ৫০ হাজার টনও কিনতে পারলাম না। এদিকে দাম রোধকল্পে প্রতিদিন ওএমএস এবং অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণ চাল বিতরণ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। তখন আমরা দরপত্র ও জি টু জি ব্যবস্থায় বিদেশ থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করে দিলাম। ভারত সতর্ক হয়ে চাল রপ্তানি সীমিত করে ফেলায় থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে তা আমদানি করতে হচ্ছিল। কিন্তু সেখান জাহাজজট সৃষ্টি হওয়ায় দূরবর্তী এ দুই উৎস থেকে চাল আসতে সময় লাগছিল। ফলে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।
এ সময় দ্রুত চাল কীভাবে আনা যায়, তা নিয়ে এক সরবরাহকারীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তিনি জানিয়েছিলেন, মিয়ানমারে চাল মজুদ রয়েছে। সেখান থেকে কিনতে পারলে দুয়েকদিনের মধ্যে দেশে চলে আসতে পারে। আইডিয়াটা আমার কাছে ভালো লেগেছিল। কিন্তু ওই সময় নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ করছিল। তখন মিয়ানমার থেকে চাল আনার চেষ্টা অনেকের কাছে দগদগে ঘায়ে নুন ছিটানো বৈ অন্য কিছু ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে চুক্তি করে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার থেকে আমরা এক লাখ টন চাল আনতে সমর্থ হয়েছিলাম। দামও পড়েছিল বেশ কম। সেটাই ছিল সে বছর আমদানি করা চালের প্রথম চালান; সেটাই ছিল আমাদের খাদ্যসংকট মোকাবিলার প্রথম হাতিয়ার।
চুক্তির ওই চাল সরবরাহ সুসম্পন্ন হওয়ার পর মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা আরও চাল ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহ করতে আগ্রহী হয়ে এ দেশ সফর করেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায় যেভাবে লেখালেখি শুরু হয়েছিল, তাতে সে আগ্রহে ভাটা চলে আসে। এখন আবার মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সংযোগে ‘Necessity knows no law’-এর মর্মার্থ সামনে এসে হাজির হয়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বর্তমানে এ দুই দেশের মধ্যে যে রূপ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বিরাজমান এবং মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে ওই দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন কোনো স্বস্তিকর পদক্ষেপ কি না? পৃথিবীতে এমন দেশ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন, যেখানে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোনো বিবদমান বা অস্বস্তিকর ইস্যু নেই। তারপরও তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থে বাণিজ্য চালিয়ে যান। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে অনেক বিবাদ রয়েছে; দেশ দুটি একবার পূর্ণমাত্রার এবং আরেকবার মাঝারিমাত্রার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এখনো তাদের সীমান্ত সংঘর্ষ অবিদিত নয়। কিন্তু এর জন্য তাদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ভারতে চীনের রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য চীনে ভারতের রপ্তানি সামান্যই; মাত্র ১২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার (Economic Times, July, 2026)।
প্রতিবেশীদের মধ্যে কিছু বিষয়ে বিবাদ থাকলেও তার জন্য বাণিজ্য বা কার্যকর চুক্তি বন্ধ হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনেক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার, যদিও বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ও চীন নিজেদের স্বার্থে সস্তায় রাশিয়ান জ্বালানি তেল ক্রয় করেছে। কাজেই শুধু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বিরাজমান বাণিজ্য সম্ভাবনার সুফল ভেস্তে যেতে পারে না। এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটলে উভয় দেশ নিজ নিজ সম্ভাবনার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। তাতে নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান বৈরিতার প্রশমন ঘটারও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আর বাংলাদেশ পাবে তার জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণে উৎস-বহুমুখীকরণের সুবর্ণ সুযোগ।
লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট





