সম্পাদকীয়
বেগতিক গতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু— সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থার ভয়াবহ বাস্তবতার দলিল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে গতকাল রবিবার ‘দৈনিক আগামীর সময়’ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ছয় বছরে ১৫ হাজার প্রাণহানি! যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের মৃত্যুহারের সঙ্গে তুলনা করার মতো ভয়াবহ এ সংখ্যা একটি শান্তিপূর্ণ দেশের জন্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
মোটরসাইকেল এখন দেশের মানুষের নিত্যদিনের চলাচলের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবহারই বেশি। ভাড়ায় চলাচলও কম নয়। স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, তুলনামূলক কম খরচ এবং গণপরিবহনের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। কিন্তু মোটরসাইকেলের সংখ্যা যত বেড়েছে, সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকিও তত বেড়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এ বিপজ্জনক প্রবণতা ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কোথায়?
ফাউন্ডেশনটির মতে, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর অবাণিজ্যিক চালক অধিকাংশই কিশোর বা সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ। যাদের মন ও মননে সবসময় হিরোইজম কাজ করে। তারা বাস্তবতার চেয়ে বেশি আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। অনেক অভিভাবক অন্ধ স্নেহবশত বা আবদার পূরণ করতে সন্তানদের বয়স ও দক্ষতা বিবেচনা না করেই মোটরসাইকেল হাতে তুলে দেন। তরুণদের এ অংশটি মোটরসাইকেলকে বাহন নয়, গতির প্রতিযোগিতার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। সড়কে উচ্চগতির প্রদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন তুচ্ছ করার প্রবণতা তাদের মধ্যে ভয়াবহভাবে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটরসাইকেল নিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কসরত প্রদর্শনের প্রবণতাও উদ্বেগের। এসব আচরণকে নিছক তারুণ্যের উচ্ছ্বাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি ভুল সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই একটি পরিবারকে আজীবন শোকে ডুবিয়ে দিতে পারে।
দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ট্রাফিক আইন না মানা, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, অদক্ষ ও অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, ভুয়া বা যথাযথ যাচাই ছাড়া লাইসেন্স, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের দুরবস্থা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা— সবকিছু মিলেই সৃষ্টি হচ্ছে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি।
চালকদের আচরণগত দুর্বলতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন নাগরিককে লাইসেন্স দেওয়ার আগে তার দক্ষতা, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান ও নিরাপদ চালনার সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের সদুত্তর প্রয়োজন। একইভাবে সড়কে আইন ভাঙার পর শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার পর মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান চালিয়ে সড়ক নিরাপদ করা যাবে না। প্রয়োজন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কোন সড়কের কোন স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে, কোন বয়সী চালক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন, কোন ধরনের যানবাহন বা সড়ক অবকাঠামো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী— এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজও থাকা জরুরি।
সড়কে বেপরোয়া মোটরসাইকেলচালকদের জেল-জরিমানা কার্যত কম দেখা যায়। আইন লঙ্ঘন করলে স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক বা বিশেষ ব্যক্তির পরিচয়ের প্রভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগে অনীহার অভিযোগ বেশ পুরনো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকা এক্ষেত্রে স্পষ্ট ও জোরালো করতে হবে। অধিকাংশ দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি।




