পোষা প্রাণীই বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অনেকেরই শখ করে বাড়িতে কুকুর-বিড়াল পোষেন। পরিবারের সদস্যের মতোই তাদের সঙ্গে বসবাস, কখনো একই বিছানায় ঘুমান; কিন্তু অসতর্কতার সামান্য সুযোগে সেই পোষা প্রাণীর কামড় বা আঁচড় থেকেই তৈরি হতে পারে প্রাণের ঝুঁকি। শখের কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। গত মার্চ থেকে আগস্টের প্রথম চার দিন পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা ও চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৬১ জন।
হাসপাতালের হিসাব বলছে, মার্চে কুকুর ও বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৪ জন। এপ্রিলে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭-এ। মে ও জুনে ৭৩ জন চিকিৎসা নেন। জুলাইয়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে— এক মাসেই চিকিৎসা নেন ১১৩ জন। এরপর আগস্টের প্রথম তিন দিনেই আরও ২১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীর মধ্যে নতুন আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পরবর্তী ডোজ নিতে আসা রোগীরাও রয়েছেন।
আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ার চিত্রটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিকাকেন্দ্রেও স্পষ্ট। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সংক্রামক ব্যাধি টিকাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ভিড়। তাদের কেউ বিড়ালের আঁচড়ে, কেউ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। গত কয়েক দিনে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মুন্সীরহাট ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ফকিরের খিল গ্রামের বীথি আক্তার (২৩), কমুয়া গ্রামের মাহমুদা আক্তার (২০), আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামের সেলিনা আক্তার (৪৫), জিএমহাট ইউনিয়নের পশ্চিম বশিকপুর গ্রামের তানহা (১৬), দরবারপুর ইউনিয়নের পূর্ব দরবারপুর গ্রামের সানজিদা আক্তার (১৮), সদর ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর গ্রামের হারাধন চন্দ্র বিশ্বাস (৫৭) এবং মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ফকিরের খিল গ্রামের সজীব (৩৩)।
শুধু রোগী বাড়ছে এমন নয়; প্রাণী নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদানের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। ফুলগাজী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তারেক মাহমুদের দাবি, কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার জন্য বর্তমানে সরকারি বরাদ্দ নেই। আবার ফুলগাজীতে পৌরসভা না থাকায় ডগ ক্যাচার নিয়োগেরও সুযোগ নেই।
তার মতে, জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে রোগ প্রকাশ পাওয়ার পর চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই রোগটি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে জনসচেতনতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ডা. তারেক মাহমুদ মনে করেন, জলাতঙ্ক এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই কুকুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীকে টিকার আওতায় আনতে আবারও টিকাদান কর্মসূচি চালু করা দরকার।
তবে ঝুঁকি শুধু রাস্তায় থাকা কুকুর বা বিড়ালকে ঘিরে নয়— বাড়িতে পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রেও অসতর্কতার কারণে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম কিবরিয়ার ভাষ্য, ‘অনেকেই শখ করে কুকুর ও বিড়াল লালন-পালন করেন। বিশেষ করে বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো রাখা হয়। অনেকে নিজেদের বিছানায়ও বিড়ালকে ঘুমাতে দেন। এ অবস্থায় অসতর্ক মুহূর্তে নখের আঁচড় লাগতে পারে। তাই পোষা প্রাণীর নখ নিয়মিত ছোট রাখা এবং প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।’
পোষা প্রাণী নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি। অনেকের ধারণা, শুধু কুকুরের কামড়েই হয় জলাতঙ্ক; কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্কে আক্রান্ত যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড় থেকেই ছড়াতে পারে এ রোগ। বিড়াল ও শিয়ালও এর মধ্যে রয়েছে। এমনকি ছোট আঁচড় বা সামান্য ক্ষতকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই।
এ কারণে প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর প্রথম কাজ হওয়া উচিত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা। ডা. গোলাম কিবরিয়ার পরামর্শ, আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে দ্রুত যেতে হবে হাসপাতালে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকার পূর্ণ কোর্স। ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি টিকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীর আসা-যাওয়া থেকেই বোঝা যায়, সমস্যাটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সংক্রামক ব্যাধি টিকাকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা স্যাকমো সুমিতার জানিয়েছেন, প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসছেন রোগীরা। তাদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
জলাতঙ্কের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। অথচ আক্রান্ত হওয়ার পরপরই সঠিকভাবে ক্ষত পরিষ্কার করা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রতিষেধক টিকার পূর্ণ কোর্স নিলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।




