অন্ধকারে আলোর দ্যুতি আবুল হোসেন

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অধ্যাপক আবুল হোসেন
শ্রেণিকক্ষে ৩৫ বছর হিসাববিজ্ঞানের কঠিন কঠিন সব হিসাব শেখাতেন। কিন্তু জীবনের হিসাবনিকাশে তিনি মেলাতে চেয়েছিলেন অন্য এক সমীকরণ— যেখানে নিজের প্রাপ্তির খাতা শূন্য হলেও সমাজের অবহেলিত, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও এতিম শিশুদের জীবনে আলো ফোটানোতেই সার্থকতা।
পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। ১৯৯৪ সালে পাবনা শহরতলির সিংগা এলাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মানব কল্যাণ ট্রাস্ট’। তিন দশক ধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, মূক-বধির, অটিস্টিক ও পিতৃহীন শিশুদের আশ্রয় দিয়েছে তার এই প্রতিষ্ঠান।
আবুল হোসেন ২০০২ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেলেও বিশ্রাম নেওয়ার বদলে নিজেকে সঁপে দেন মানবসেবায়। মানব কল্যাণ ট্রাস্টে বর্তমানে দেশের ২২টি জেলা থেকে আসা সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১৩০ আবাসিক শিক্ষার্থী আছে। এর মধ্যে ১৩ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্র ব্রেইল পদ্ধতিতে কায়দা ও ১৫ জন কোরআন শরিফ পাঠে পারদর্শী হয়ে উঠছে। আরও ২৮ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী স্কুল এবং কলেজে পড়াশোনা করছে। এ ছাড়া হেফজ শাখায় ৫০ অনাথ-এতিম, ১০ শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং ১৪ অটিস্টিক ও মূক-বধির শিশু পরম ভালোবাসায় বেড়ে উঠছে।
তবে একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা আবুল হোসেনের একার পক্ষে কখনোই সহজ ছিল না। ট্রাস্টের ১৮ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনসহ আবাসিক শিক্ষার্থীদের ভরণ-পোষণের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকার সংস্থান করতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় তাকে। সমাজের বিত্তবান ও সহানুভূতিশীল মানুষের জাকাত, ফিতরা ও প্রবাসী বাঙালিদের অনুদানে সচল রয়েছে এই মানবিক কর্মযজ্ঞ।
ট্রাস্টের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করতে আবুল হোসেন এখন পথশিশুদের পুনর্বাসনে অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। পথশিশুদের খুঁজে বের করে তাদের শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা খরচে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং অবশেষে বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও অধ্যাপক আবুল হোসেনের চোখে এখনো নতুন স্বপ্ন— এই ভবনটির কাজ সম্পন্ন করা, ট্রাস্ট প্রাঙ্গণেই বিনামূল্যের একটি চিকিৎসা কেন্দ্র ও সহায়-সম্বলহীন বৃদ্ধদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মানব কল্যাণ ট্রাস্ট প্রাঙ্গণে একটি চারতলা এতিমখানা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।
মানব কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে এসএসসি, এইচএসসি শেষে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করেছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আব্দুল জলিল। কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি বলছিলেন, ‘আর্থিক সংগতি না থাকায় ইচ্ছে থাকলেও পরিবার লেখাপড়া চালাতে পারছিল না। অন্ধ হওয়ায় আগ্রহও খুব একটা ছিল না। সে সময় আমি মানব কল্যাণ ট্রাস্টে আসি। এখানে আবুল হোসেন স্যারের সহায়তায় ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়তে শিখে আমার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’
পাবনা প্রেস ক্লাবের সম্পাদক জহুরুল ইসলাম মনে করেন, অধ্যাপক আবুল হোসেন শুধু পাবনার গর্ব নন, তিনি অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ।




