উধাও মোনালিসা

প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চুরি করে রঙমিস্ত্রি ভিনসেনজো পেরুজিয়া
প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চুরি হয়ে যায় ১৯১১ সালের ২১অগাস্ট। সেটা ছিল কোনো এক রোববার রাত। চুরির ঘটনার ২৬ ঘন্টা পর টনক নড়ে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের। নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে দেখতে পায় ছবিটা দেয়ালের ঠিক যে জায়গায় বসানো ছিল তা শূন্য। হৈ চৈ পড়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ফরাসি পুলিশ তদন্তে নামে। বন্ধ করে দেয়া হয় ফ্রান্স থেকে বের হওয়ার সমস্ত পথ। কিন্তু চোর কোথায়?
এই অগাস্টে পৃথিবী জুড়ে তোলপাড় ফেলে দেয়া ছবি চুরির ঘটনাটির বয়স হলো ১১৫ বছর।
ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস চার হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ছবিটি কেনেন ১৫১৭ সালে। পরে ছবির মালিক বনে যান সম্রাট নেপোলিয়ন। তার মৃত্যুর পর মোনালিসার স্থান হয় ল্যুভর মিউজিয়ামে। ততদিনে ছবিটির ঐতিহ্যগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অমূল্য হয়ে উঠেছে।
তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা প্রথমে বিশেষ কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি। একজন রক্ষী ভিতর থেকে খুলে ফেলা একটি দরজার হাতল পেয়েছিল ভবনের পেছন দিকের সিঁড়িতে। একজন কাঠমিস্ত্রি জানিয়েছিল, জাদুঘরেরই কেউ একজন তাকে ডেকে এনেছিল হাতলটি মেরামত করার জন্য। দরজা খোলা ও বন্ধের সময় আটকে যাচ্ছিলো বারবার। আরেকজন রক্ষী জাদুঘরের পেছন দিকের রাস্তায় একটি শূন্য কাঠের বাক্স খুঁজে পায়। গোয়েন্দারা সেই বাক্সের গায়ে কিছু আঙুলের ছাপ পায়। চিত্রচোরকে ধরতে দায়িত্ব দেয়া হয় ফরাসি গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা আলফান্সো বার্তেলিয়নকে। আলফান্সো কাজে নেমেই ঘটনার দিন জাদুঘরে কর্মরত ছিল এমন ২৫৭ জন কর্মচারীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয় গোটা দেশের পেশাদার অপরাধীদের আঙুলের ছাপ। ফরাসি পুলিশ মোনালিসার ছবি সম্বলিত ৬,৫০০ লিফলেট বিলি করে। কেউ চোর আর ছবির সন্ধান দিতে পারলে তার জন্য ৪০ হাজার ফরাসি মুদ্রার পুরষ্কারও ঘোষণা করে পুলিশ বিভাগ। কিন্তু তাদের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। চিত্রচোরের কোনো সন্ধানই পাওয়া যায় না।
চুরির ঘটনার এক মাস পর গোয়েন্দারা হঠাৎ করে আটক করে ফরাসি কবি গিয়্যাম অ্যাপোলোনিয়ারকে। সঙ্গে কয়েকজন মিশরের কয়েকজন ছাত্রকেও ধরা হয়। তারা প্যারিসে ঘুরতে এসে সেই দিন জাদুঘরে দর্শনে গিয়েছিল। কবিকে আটকের প্রধান কারণ ছিল, তাঁর তখনকার ব্যক্তিগত সচিব গ্রে পিঁরেত একদা ছবি চোরদের একটি দলে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিল। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অ্যাপলোনিয়ার বেশ ঘাবড়ে গিয়ে বলে দেন চিত্রকর পাবলো পিকাসোর নাম। গোয়েন্দারা তখন পিকাসোকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছাড়েনি। পরে পত্র-পত্রিকায় খবর ছড়িয়েছিল, গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করতে এলে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন পিকাসো অ্যাপোলোনিয়ারের ওপর।
দুই বছর ধরে ফরাসি পুলিশ চুরি যাওয়া মোনালিসাকে খুঁজে বেড়ায় ইউরোপ জুড়ে। তখন ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার ছবির জন্য নির্দিষ্ট দেয়ালটি খালি রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সেই শূন্যস্থান দেখার জন্যও প্রচুর দর্শক ভিড় জমাত জাদুঘরে।
দুই বছর নানা জায়গায় জাল ফেলে অবশেষে গোয়ন্দারা ধরে ফেলে সেই চিত্রচোরকে। তার নাম ভিনসেনজো পেরুজিয়া। ইতালিতে জন্ম নেয়া পিরুজিয়া ফ্রান্সে বসবাস করত। পেশায় সে ছিল রঙমিস্ত্রি। মাঝে কিছুদিন প্যারিসে একটি কাচ কাটার দোকানে কাজ নিয়েছিল সে। আর সেই সূত্রেই জানালা মেরামতের কাজ নিয়ে সে জাদুঘরে ঢুকেছিল। তখনই পিরুজিয়া মোনালিসা উধাও করার পরিকল্পনা আঁটে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, দুই বছর ছবিটি সে নিজের ফ্ল্যাটেই রেখে দিয়েছিল।
উত্তেজনা থিতিয়ে গেছে ভেবে সে ছবিটি বিক্রির পরিকল্পনা করে। ১৯১৩ সালে তার লেখা চিঠি পৌঁছায় ফ্লোরেন্সে এক আর্ট ডিলারের কাছে। চিঠিতে পিরুজিয়া ৫ লক্ষ লিরা মূল্য ঠিক করেছিল মোনালিসার জন্য। সেই চিঠিই তার জন্য কাল হয়েছিল। ইতালির গোয়েন্দা বিভাগ সেখানকার ডাক বিভাগের সূত্রে চিঠির সন্ধান পেয়ে খবরটা জানিয়ে দেয় ফরাসি গোয়েন্দা বিভাগকে। পুলিশ পৌঁছে যায় পিরুজিয়ার ফ্ল্যাটের দরজায়।
তুখোড় চোর পিরুজিয়া চালাকি করে আদালতে নিজের অবেদনে বলেছিল, ছবি চুরির পেছনে তার প্রধান কারণ ছিল দেশপ্রেম। মোনালিসা দা ভিঞ্চির আঁকা। তাই সেটির স্থান হওয়া উচিত ইতালিতেই। তার এমন বক্তব্যের কারণে আদালত তাকে মাত্র এক বছর ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু সাত মাস কারাভোগ করেই পিরুজিয়া মুক্ত হয়ে যায়। গোয়েন্দাদের অনুমান, সে ছবি চোরদের চক্রের প্রভাব কাজে লাগিয়েছিল। কারামুক্তির পর সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষ হলে আবার ফিরে আসে ফ্রান্সে। প্যারিসেই ১৯২৫ সালে মৃত্যু হয় বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রচোর ভিনসেনজো পিরুজিয়ার।







