সংবিধানে প্রতিশ্রুতি বাস্তবে বৈষম্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জনগণ এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোনো দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনি চুক্তি। এ চুক্তিতে নাগরিক হলেন সব ক্ষমতার মূল উৎস ও অধিকারের প্রকৃত দাবিদার, আর রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক কাঠামো হলো সেই অধিকার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকা দায়িত্ববাহক। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের কাছে মৌলিক জনসেবা— যেমন নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা পৌঁছে দেয়, তখন তা কোনো বিশেষ কৃপা নয়; বরং নাগরিকের পাওনা অধিকারের সংবিধিবদ্ধ রূপায়ণ।
সংবিধান এ মৌলিক আইনি ভিত্তির সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ। গণপ্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইনের মূল দিকই হলো নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং অনুচ্ছেদ ১১ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হবে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। অনুচ্ছেদ ১৫ ও ১৬-তে নগর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার বৈষম্য দূর করে প্রান্তিক মানুষের কাছে মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় দায়ের কথা বলা হয়েছে, আর অনুচ্ছেদ ১৮ ও ১৮ক-তে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করাকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ আদালতের যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করা হয়েছে, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়ার অধিকার বস্তুত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২-এর অধীনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রগতিশীল ধারাগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান সামাজিক সমতার পথে একটি বড় অন্তরায়। নীতি-দলিলের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে; কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভূপ্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততার ভয়াবহ বিস্তারের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ও তরুণীকে নিরাপদ পানির খোঁজে মাইলের পর মাইল কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়, যা তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্যের ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
হাওর কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের মতো প্রান্তিক ভৌগোলিক এলাকার মানুষ কাঠামোগত দূরত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় মূলধারার পরিষেবা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত থাকেন। ভারতের মতো বিকাশমান অর্থনীতিতে গ্রামীণ জনসেবা নিশ্চিত করতে ‘সোশ্যাল অডিট’ বা সামাজিক নিরীক্ষাকে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে। দেশটির মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইনের অধীনে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই সরকারি খাতের কাজের মান ও বাজেট বরাদ্দ নিরীক্ষা করেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রেখেছে।
কেনিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ২০১৩ সালের সাংবিধানিক বিকেন্দ্রীকরণ ও ‘ওয়াটার অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে পানি সরবরাহকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং স্থানীয় কাউন্টি সরকারগুলোর ওপর জবাবদিহির আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে নাগরিকদের ওয়াটার ইউজার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে সরাসরি যুক্ত করা হয়। একইভাবে, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক জনসেবাগুলোর মান মূল্যায়নে ‘সিটিজেন রিপোর্ট কার্ড’ ও Community-Based Monitoring ব্যবস্থার ব্যাপক প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিক অনমনীয়তা ভেঙে তৃণমূলের কণ্ঠস্বরকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হয়েছে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের পাবলিক পলিসি ও পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নীতি চাপিয়ে দিলে সরকারি সেবার গুণগত উন্নতি হয় না; বরং নাগরিক ও সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ‘প্রবলেম-সলভিং কোলাবোরেশন’ বা সমস্যা সমাধানমূলক অংশীদারত্ব তৈরি হলে সেবা কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন, যখন সাধারণ মানুষ তথ্য পাওয়ার অধিকার ব্যবহার করে কোনো প্রকল্পের বাজেট ও মান সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ আত্মসাতের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইকোনমিক গ্রোথ সেন্টারের গবেষকদের নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবা বিতরণ ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত ফিল্ড এক্সপেরিমেন্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসব অঞ্চলে স্থানীয় নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিক ‘সোশ্যাল অডিট’ এবং স্বচ্ছ ডেটা অ্যাকসেস দেওয়া হয়েছিল, সেখানে সেবা প্রদানকারীদের ফাঁকিবাজি ও জবাবদিহিহীনতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বাংলাদেশেও নাগরিকদের নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক থেকে সক্রিয় তদারককারীতে রূপান্তরিত হওয়ার সময় এসেছে। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন এক্ষেত্রে নাগরিকদের হাতে একটি অত্যন্ত কার্যকর আইনি হাতিয়ার। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মুখোমুখি বসে ‘জনশুনানি’ আয়োজন এবং ‘কমিউনিটি স্কোরকার্ড’-এর মাধ্যমে সেবার গুণগত মান মূল্যায়ন করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নীতিমালায় রাখা রয়েছে। অধিকন্তু যখন পরিবেশগত দূষণ, নদীদখল কিংবা সুপেয় পানির উৎস ধ্বংসের মতো চরম জনস্বার্থবিরোধী ঘটনা ঘটে, তখন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২-এর আওতায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে মামলার মাধ্যমে আইনি প্রতিকার ও বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।
তবে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক চালিকাশক্তিতে অবস্থানরত আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এটি উপলব্ধি করতে হবে, নাগরিকদের তথ্য দাবি করা, সামাজিক নিরীক্ষা চালানো কিংবা সেবার মান নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলা কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ নয়।
লেখক: উন্নয়নকর্মী




