সম্পাদকীয়
ফসকা গেরো

বাংলাদেশের অর্থনীতি যত ডিজিটাল হচ্ছে, ততই বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অনলাইন লেনদেন ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধীচক্রের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। গতকাল শনিবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘পাহাড় সমতলে সাইবার চক্র, নাজুক নিরাপত্তা’ শীর্ষক প্রতিবেদন আবারও একটি ভয়ংকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এর আগে লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে সক্রিয় বিভিন্ন সাইবার অপরাধী পালিয়ে এসে বিশেষত বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই একই ধরনের চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার খবর প্রকাশিত হলো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক হওয়া বিদেশি অপরাধীদের অধিকাংশ চীনের নাগরিক। তবে অপরাধের দায় সর্বদা কোনো দেশ বা দেশের সাধারণ জনগণের ওপর বর্তায় না; দায় অপরাধীর ব্যক্তিগত। প্রশ্ন হলো, তারা কীভাবে বারবার বাংলাদেশকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে? তারা কি এ দেশে বৈধভাবে অবস্থান করছে? কেন একই ধরনের অপরাধী চক্র ভেঙে দেওয়ার জোরালো প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়? কোথায় আমাদের দুর্বলতা?
প্রথম দুর্বলতা হলো বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সমন্বয়হীনতা। দেশে প্রবেশের পর কে কোথায় অবস্থান করছে, কতদিন অবস্থান করছে এবং তার কার্যক্রম কতটা বৈধ— এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবতা ফসকা গেরোর মতো। প্রয়োজন বজ্র আঁটুনির। পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাড়া বাসা, রিসোর্ট বা অস্থায়ী আবাসন ব্যবস্থায় পরিচয় যাচাই অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। সাইবার অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেও অপরাধীরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করছে, যা প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন। গ্রেপ্তারের পর বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে অপরাধীরা নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।
এই অপরাধী চক্র মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেয়, পরিচয় চুরি করে, অনলাইন জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবারকে নিঃস্ব করে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গেও তাদের যোগসূত্র পাওয়া যায়। ফলে এদের কর্মকাণ্ডকে কেবল প্রতারণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্ত ও দুর্গম এলাকায় এদের ঘাঁটি থাকায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত কিছু সাইবার অপরাধী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অভিযান জোরদার হওয়ার পর নতুন ঘাঁটি খুঁজছে। বাংলাদেশকে যদি তারা সহজ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য এটি লজ্জাজনক যে, বিদেশি অপরাধীরা এখানে এসে অবাধে প্রতারণার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সাহস পায়।
এ অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় জরুরি। বিদেশি নাগরিকদের নিবন্ধন ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সন্দেহজনক কল সেন্টার, আইটি প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন ব্যবসার আড়ালে পরিচালিত অপরাধী নেটওয়ার্ক দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। পাহাড়ি ও পর্যটন এলাকায় বিদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যেসব দেশের নাগরিক এসব অপরাধে জড়িত, তাদের আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে তথ্যবিনিময় ও যৌথ তদন্তের ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত। যাতে বাংলাদেশকে কেউ অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে না করে।



