ছাড় দেওয়া চলবে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের জেলা শহরগুলোর অলিগলিতে ‘কিশোর গ্যাং’ বা কিশোর অপরাধী চক্রের আশঙ্কাজনক উদ্ভব ও বিস্তার রোধে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হাতে ধারালো চাপাতি কিংবা ছুরি, চোখে নেই ভয়ের ছাপ, শরীরী ভঙ্গি আক্রমণাত্মক— এসব কিশোরের বয়স বড়জোর ১৫-১৬ কিংবা তার চেয়েও কিছু কম। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মেতে ওঠা এই কিশোরদের দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটাই বোধ হয় অপরাধের চূড়ান্ত রূপ।
কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, এই অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণরা আসলে সামনের সারির ‘ফুট সোলজার’ মাত্র। পর্দার আড়াল থেকে সুতা টানছে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। সোমবার দৈনিক আগামীর সময় পত্রিকায় “কিশোর গ্যাং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘জ্বালানি’” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, একসময় যারা নিজেরাই ছিলেন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তারাই এখন হয়ে উঠেছেন ভয়াবহ অপরাধ-সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক। তাদের বয়স বেড়েছে, পরিচয় বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি অপরাধের ধরন। বরং এখন তারা নতুন প্রজন্মের কিশোরদের ব্যবহার করছে নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাহিনী হিসেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এই কিশোররাই এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের একধরনের ‘জ্বালানি’।
র্যাব সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং চিহ্নিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকায় দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব গ্যাংয়ের সক্রিয়তা বেড়েছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতেই সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগে এসব গ্যাং মূলত মারামারি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা ছোটখাটো অপরাধে জড়িত থাকলেও এখন হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি এমনকি ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।
প্রশ্নে উঠছে, যে কিশোরদের স্কুল কিংবা খেলার মাঠে থাকার কথা, তাদের হাতে কেন প্রাণঘাতী অস্ত্র? এই প্রশ্ন আজ গোটা সমাজকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোরদের এই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে মূলত কাজ করছে তীব্র দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব, পারিবারিক কলহ ও ভাঙন, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, ত্রুটিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির লাগামহীন অপব্যবহার। এই সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, বয়ঃসন্ধির শেষ দিকে জৈবিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পরিবার বা বিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাই এই সময় তাদের প্রয়োজন হয় সঠিক দিকনির্দেশনার। আর সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত করে।
কিশোররা অপরাধে যুক্ত হলে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। কিন্তু যারা নিজেদের বিত্তবৈভবের স্বার্থে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ থেকে কিশোরদের ব্যবহার করছে, তাদের বিষয়ে নীতিনির্ধারণী মহল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যারা রাজনৈতিকভাবে পর্দার আড়ালের এই কুশীলবদের ‘শেল্টার’ দিচ্ছে– তাদেরও ছাড় দেওয়া চলবে না।
চারদিকে অপরাধ ও নৃশংসতার অন্ধকার পথ খুলে রয়েছে। বুঝে হোক বা না বুঝে– কিশোররা সেই পথে হাঁটছে। সেই অন্ধকার পথটি বন্ধ করতে হলে সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেটি যেমন সরকারিভাবে, তেমনি সামাজিকভাবেও। আর ইতিবাচক এসব পদক্ষেপের প্রভাব যেন পারিবারিক পর্যায়ে পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। কিশোরদের থেকে নতুন কোনো ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া’ তৈরি না হোক– এটাই আমাদের প্রত্যাশা।




