সম্পাদকীয়
উপায়হীন সরকারের ভারবাহী জনগণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনীতি এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এরই মধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের দাম, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা খরচ— সবকিছুর চাপে মানুষ যখন ন্যুব্জ, তখন চার ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনমনে নতুন করে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির যুক্তি তুলে ধরলেও বাস্তবতা হলো— এই সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। সরকারের উপায় ছিল না বলা হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উপায় কী? সরকারের যে উপায় ছিল না, এমন যুক্তি ধোপে টেকে না। ভর্তুকি দিয়ে চালিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার দৃষ্টান্ত নিকট অতীতেই আছে।
মূল্য সমন্বয়ের ফলে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো সুবিবেচনার পরিচয় নয়। ধাপে ধাপে বাড়ানোর সুযোগকে আমলে নেওয়া যেত। বৈশ্বিক বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সরকার বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বলেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। যে মূল্যই নির্ধারিত হোক, বিপিসি লোকসানে থাকে না। এ সিদ্ধান্তে ভোক্তা অধিকার-সংশ্লিষ্ট মহলও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কারণ, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। শেষ পর্যন্ত সবকিছুর মূল্য সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকেই আদায় করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো গণপরিবহন খাত। অতীত বলছে, জ্বালানির দাম সামান্য বাড়লেই বাস-মিনিবাস, ট্রাক মালিকরা অযৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু হয়। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এরই মধ্যে দূরপাল্লার বাস সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা বা তোয়াক্কা না করে আগেই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করেছে। ভাড়া বাড়ার ফলে শহর থেকে গ্রাম— সব জায়গায় যাত্রী হয়রানি বাড়ে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনগণের জন্য হয়ে ওঠে ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’।
আরও একটি বাস্তবতা হলো, দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের যে ভয়াবহ বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা অসহনীয় হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, বেতন বা আয় বাড়ে ধীরে, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে দ্রুত। জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি সেই সংকটকে আরও প্রকট করবে। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, কৃষক কিংবা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীদের জীবনযাপনে নাভিশ্বাস উঠবে। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে দ্রুত সমন্বয় করা হয়; কিন্তু যখন দাম কমে, তখন কি একই গতিতে তার সুফল ভোক্তারা পান?
সরকারেরও কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব এড়ানো কঠিন। কিন্তু সেই বাস্তবতা মোকাবিলার দায়িত্বও সরকারের। শুধু মূল্য বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। জ্বালানি খাতে অপচয়, চুরি, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা কমানো গেলে জনগণের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমত গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো জরুরি। জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।



