সম্পাদকীয়
ছোট মনে বড় ক্ষত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিতে তৈরি হয় না; তৈরি হয় শিশুদের মননে ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে। তাই শিশুর হাসিকে শুধু ছবি তোলার বিষয় না বানিয়ে তার ভেতরের কষ্টকেও বুঝতে হবে। আজকের মানসিকভাবে সুস্থ শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের আত্মবিশ্বাসী, মানবিক নাগরিক।
শৈশবকে আমরা সাধারণত হাসি, খেলাধুলা ও আনন্দের সময় হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিশু ও কিশোরের মনের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে এমন কিছু সংকট, যার খবর পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজ সময়মতো জানতে পারছে না। আর জানলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অজ্ঞতা, সামাজিক সংকোচ ও কুসংস্কারের কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা মিলছে না। চলমান সময় আমাদের শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের অনুকূল পরিবেশ বলা যাবে না। গতকাল শনিবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘শৈশবে মনের অসুখ’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যাটি জটিল। পরিবারে অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ, অভিভাবকের অবাস্তব প্রত্যাশা, পারিবারিক অশান্তি, বুলিং বা সহপাঠীর নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং ডিজিটাল জগতের নানা চাপ শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার পায়নি। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রয়োজনীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও কাউন্সেলিং সুবিধা অপ্রতুল।
শিশুর মন খারাপ, অতিরিক্ত ভয়, একাকিত্ব, অস্বাভাবিক রাগ, পড়াশোনায় হঠাৎ অনীহা, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন, বন্ধুদের এড়িয়ে চলা; কিংবা সবসময় চুপচাপ থাকা— এসবকে অনেক সময় আমরা ‘বয়সের দোষ’ বলে উড়িয়ে দিই। অথচ এসব আচরণ মানসিক সমস্যার সংকেত হতে পারে। শিশু কথা দিয়ে নিজের কষ্ট সবসময় প্রকাশ করতে পারে না; তার আচরণই অনেক সময় হয়ে ওঠে সেই কষ্টের ভাষা। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তাকে উপদেশ দেওয়ার জন্য নয়, তার কথা শুনতে হবে আগের। তার কথা শেষ করার আগেই বিচার করা যাবে না। ভুল করলে অপমান নয়, বোঝাতে হবে। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করে আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা যাবে না। তাকে চেষ্টার সুযোগ দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পরিবর্তন জরুরি। বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হলে শিক্ষকরা প্রয়োজনে শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা যেন করে থাকেন। শিক্ষা হবে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভুল করা অপরাধ নয় এবং সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
ডিজিটাল যুগে শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ভারসাম্য। প্রযুক্তি থেকে সন্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বয়সোপযোগী স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা, পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেটে ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কেও শিশু-কিশোরদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। শিশুর কষ্টকে অবহেলা নয়, পরীক্ষার নম্বরের চেয়ে সন্তানের মানসিক সুস্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শৈশব যদি নিরাপদ ও আনন্দময় হয়, ভবিষ্যৎও ততটাই সুন্দর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা সম্প্রসারণ, স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং চালু, প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি এবং কম খরচে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচিও জোরদার করতে হবে।



