সম্পাদকীয়
নিখোঁজ সংবাদ ও নির্বিকার রাষ্ট্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা, মানবিকতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার শিশুদের নিরাপত্তা দিয়ে। যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সে দেশে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্যের গল্প যতই শোনানো হোক— সেই রাষ্ট্রের বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক এক তথ্যের পরিসংখ্যান আমাদের সামনে এমনই এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। গত সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে কিংবা তারা পরিবারে ফিরে গেছে। বাকি ২ হাজার ৩৮ শিশুর কোনো সন্ধান মেলেনি, অর্থাৎ এখনো এসব শিশুর ভাগ্য অজানা। তাদের তথ্য জাতির সামনে প্রকাশ করা জরুরি।
প্রশ্ন হলো, এত শিশু কোথায় যাচ্ছে? কারা তাদের নিয়ে যাচ্ছে? তারা কি মানব পাচারের শিকার, নাকি শিশুশ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি, অপরাধচক্র কিংবা অন্য কোনো অন্ধকার জগতের বলি হচ্ছে? মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হচ্ছে কি না— এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর রাষ্ট্র এখনো দিতে পারেনি। এটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। শিশু পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক। কিন্তু এসব চক্রের মূল হোতার কজন আইনের আওতায় এসেছে, সেটিরও স্পষ্ট জবাব নেই। অপরাধীরা যদি শাস্তির ভয় না পায়, তাহলে শিশু নিখোঁজের ঘটনা কীভাবে কমবে?
সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব আরও বেশি। অথচ বাস্তবতা হলো, শিশু নিখোঁজের ঘটনা বাড়ছে; কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ কিংবা উদ্ধার কার্যক্রমের দৃশ্যমান সাফল্য সীমিত। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর পেছনে একটি পরিবারের জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। মা-বাবা দিনের পর দিন থানা, আদালত, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়ান। অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত আশাহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তখন শুধু জিডি গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় এখনো নিখোঁজ শিশু অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ নেওয়ার পর তদন্তে গতি থাকে না। আন্তঃজেলা কিংবা আন্তঃসীমান্ত সমন্বয় দুর্বল। আধুনিক প্রযুক্তি, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, মোবাইল ট্র্যাকিং কিংবা জাতীয় ডেটাবেজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা দেখা যায় না। ফলে সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু শিশুরা ফিরে আসে না।
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সমাজেরও দায় রয়েছে। পরিবারে নজরদারির অভাব, অনলাইন যোগাযোগের ঝুঁকি, সামাজিক অবক্ষয় এবং দারিদ্র্য অনেক শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। তবে এসব কারণ দেখিয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেউ দায় এড়াতে পারে না।
এ অবস্থায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত শিশু নিখোঁজকে জাতীয় জরুরি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা। প্রতিটি থানায় শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত অভিযোগকে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তুলে দেশের সব থানাকে একই নেটওয়ার্কে আনা যেতে পারে।
মানব পাচার ও শিশু অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে শিশু নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা, অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন এবং জরুরি সহায়তা নম্বর সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষিত করতে হবে। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে নয়; একজন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।





