সম্পাদকীয়
অলৌকিক বদ্বীপের বিশৃঙ্খল কারিগর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাগজে-কলমে আমাদের কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্জনের শেষ নেই। বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত দিয়ে চোখধাঁধানো এক তালিকায় দেখা গেল— বিশ্বের ৯৩টি দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলাদেশ মোট ভূমির অনুপাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চাষযোগ্য জমির মালিক! দেশের প্রায় ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ ভূখণ্ডই আবাদযোগ্য! এমনকি ডেনমার্ক, ভারত কিংবা ইউক্রেনের মতো কৃষি-উদ্বৃত্ত দেশগুলোকেও আমরা ‘আবাদি জমির শতাংশে’ হারিয়েছি। বরফ নেই, মরুভূমির হাহাকার নেই, আছে হিমালয় ধুয়ে আসা সোনার পলি! কিন্তু এই তালিকার বিপরীতে দেখা যায় এক কদর্য বাস্তবতা।
চাষযোগ্য জমির হারে বিশ্বসেরা হওয়ার পরও প্রতি বছর চাল, গম, পেঁয়াজ আর ডাল আমদানির জন্য কেন আমাদের বহুজাতিক বাজারে হাত পাততে হয়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের আত্মতুষ্টি আর কাঠামোগত হিপোক্রেসির ভেতরে। প্রাকৃতিকভাবে আমরা এক অলৌকিক বদ্বীপের বাসিন্দা, কিন্তু ব্যবস্থাপনাগতভাবে যেন এক অনন্ত বিশৃঙ্খলার কারিগর।
আমাদের প্রথম প্রজ্ঞা প্রকাশ পায় কৃষিজমি ধ্বংস করার মহোৎসবে। নদীমাতৃক পলিমাটির সুফলা জমিগুলোতে পরম উৎসাহে আমরা গড়ে তুলছি ইটভাটা, অপ্রয়োজনীয় আবাসন আর অপরিকল্পিত রিসোর্ট। যেন খাদ্য নিরাপত্তা খালি পেটে থাকে, আর অবকাঠামোর ‘উন্নয়ন’ থাকে রাজপ্রাসাদে! একদিকে আবাদযোগ্য জমি দিন দিন শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে এক বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর স্রেফ ‘পতিত’ হয়ে পড়ে থাকছে। আবার কোথাও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলাভিযানে। এই বৈপরীত্য কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের দেশের কৃষিব্যবস্থার চিত্র হতে পারে?
তার ওপর যোগ হয়েছে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ধ্রুপদি চাপ। ভূখণ্ড ছোট, মুখ কোটি কোটি। তবে জনসংখ্যা বাহানা বানিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা একেবারেই অকেজো। সমস্যা তো শুধু জনসংখ্যার আকার নয়; সমস্যা সঠিক পরিকল্পনা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও আধুনিক প্রযুক্তির তীব্র অভাবে। একই জমিতে বহুমাত্রিক ফসল বা ‘মাল্টি-ক্রপিং’-এর প্রাকৃতিক সুযোগ থাকার পরও আমাদের কৃষক উপযুক্ত মূল্য পান না, আর কৃষি খাত আজ আধুনিক সেচ, হিমাগার সংরক্ষণব্যবস্থা এবং সুষ্ঠু বিপণনের অভাবে ধুঁকছে।
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ আর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় খাদ্যের বৈশ্বিক শৃঙ্খল হুমকিতে আছে। উন্নত বা অনুন্নত— সব দেশের জন্যই খাদ্য নিরাপত্তা এখন টিকে থাকার মূল লড়াই। এই সংকটকালে আমাদের ‘বিশ্বসেরা আবাদযোগ্য ভূমি’ কোনো কাজে আসছে কি? আদতে না। বিশ্ববাজারে গমের দাম বাড়লে আমাদের বাজারে হাহাকার পড়ে; ডাল কিংবা ভোজ্য তেলের দাম বাড়লে মধ্যবিত্তের থালা খালি হয়।
প্রকৃতি আমাদের ঝুড়ি ভরে উর্বর মাটি আর আশীর্বাদ দিয়েছিল। কিন্তু আমরা সেই আশীর্বাদ তোশকের নিচে চাপা দিয়ে আমদানিনির্ভর আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবসায়ী ফায়দার ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে ভালোবাসি। একদিকে উর্বর পলিমাটিতে ঢালাইয়ের কংক্রিট ঢালা, অন্যদিকে বিদেশি চাল-গমের জাহাজের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা— এই দ্বিমুখী তামাশা শুধু আমরাই পারি!
কাগজে-কলমে কৃষিতে বিশ্বমুকুট পরে থাকা আর বাস্তব থালায় আমদানি করা অন্নের ওপর নির্ভর করা— এই পরিহাস হয়তো আমাদেরই মানায়! এখনই যদি কড়া আইনের মাধ্যমে আবাদি জমি রক্ষা করা না যায়, পতিত জমি চাষে বাধ্য না করা হয় এবং কৃষকদের সঠিক মূল্য না দেওয়া হয়, তবে একদিন ‘বিশ্বের শীর্ষ চাষযোগ্য জমির দেশ’-এর ভৌগোলিক গৌরব বুকে নিয়েই আমাদের ইতিহাস তৈরি করতে হবে অনাহারের তালিকায়।



