মোবাইল ফোনের সঙ্গে চাই আকাশ মাঠ ও ভালোবাসা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সন্তানের হাতে আমরা স্মার্টফোন তুলে দিয়েছি, কিন্তু তার হাতে কি সময় তুলে দিতে পেরেছি? তাকে ইন্টারনেটের বিশাল জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছি, কিন্তু তার নিজের ঘরের মানুষগুলোর সঙ্গে কতটা যুক্ত রাখতে পেরেছি? সে পৃথিবীর দূরপ্রান্তের মানুষের জীবন দেখতে পাচ্ছে, অথচ পাশের ঘরে বসে থাকা দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে গল্প করার সময় যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
এটাই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে নীরব প্রশ্ন। প্রযুক্তি আমাদের সন্তানদের শত্রু নয়। বরং জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি। কিন্তু দরজা খুলতে গিয়ে যদি আমরা ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করে দিই, তাহলে সমস্যা তৈরি হয়। শিশুর চোখ স্ক্রিনে থাকবে, অথচ মন থাকবে একাকী—এমন ভবিষ্যৎ কোনো পরিবারই নিশ্চয়ই চায় না।
আজকের শিশু আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি তথ্য জানে। কিন্তু তথ্য জানা আর জীবন বোঝা এক বিষয় নয়। সে হয়তো কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একটি ঘটনা জানতে পারে, কিন্তু একজন অসুস্থ
মানুষের পাশে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, বন্ধুর কষ্ট কীভাবে বুঝতে হয়, পরাজয় কীভাবে মেনে নিতে হয় কিংবা নিজের ভুলের জন্য কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়—এসব শেখার জন্য কোনো অ্যাপ নেই।
এই জায়গাতেই প্রয়োজন সুকুমার বৃত্তির চর্চা।
একটি শিশুর সুন্দর মন একদিনে তৈরি হয় না। একটি কবিতা শুনে, একটি গল্প পড়ে, গাছের নিচে বসে, বন্ধুর সঙ্গে খেলতে খেলতে, অসহায় কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে, মায়ের মুখের গল্প শুনে কিংবা বাবার সঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হাঁটতে শিশুর ভেতরে মানবিকতার বীজ জন্ম নেয়। কিন্তু আমাদের ব্যস্ত জীবনে এসব ছোট ছোট মুহূর্তই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
সন্তানের হাতে প্রযুক্তি থাকুক, কিন্তু তার মন যেন প্রযুক্তির দখলে না যায়। তার শৈশব ফিরে পাক একটু আকাশ, একটু মাঠ, একটু বই এবং অনেকটা ভালোবাসা
আমরা সন্তানকে দামি পোশাক দিচ্ছি, ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি, আধুনিক ডিভাইস কিনে দিচ্ছি; কিন্তু তাকে কতটা সময় দিচ্ছি? সন্তানকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে গিয়ে আমরা কি তার বর্তমান শৈশবটাই কেড়ে নিচ্ছি?
শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সবসময় নতুন কোনো খেলনা নয়; অনেক সময় সে চায় বাবা-মায়ের মনোযোগ। সে চায় তার গল্পটি কেউ শুনুক, তার ভয়কে কেউ গুরুত্ব দিক, তার ছোট্ট সাফল্যে কেউ আনন্দ করুক। অথচ একই ঘরে বসে বাবা-মা যখন নিজেদের ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশুও শিখে যায়—মানুষের চেয়ে স্ক্রিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অভিভাবকের প্রথম কাজ নিষেধাজ্ঞা নয়, উদাহরণ তৈরি করা। বাবা-মা নিজেরাই যদি প্রতিটি অবসরে ফোনে ডুবে থাকেন, তাহলে সন্তানকে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার উপদেশ খুব বেশি কার্যকর হবে না। পরিবারের প্রতিদিন কিছু সময় হতে পারে ‘ফোনবিহীন সময়’। সেই সময়ে সবাই কথা বলবে, বই পড়বে, গল্প করবে, হাঁটবে, খেলবে অথবা একসঙ্গে কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হবে।
বিদ্যালয়ের দায়িত্বও এখানেই নতুন করে ভাবতে হবে। বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষার ফল তৈরির কারখানা হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, তার পাশাপাশি সে কেমন মানুষ হচ্ছে—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিদ্যালয়ে সাহিত্য,
সংগীত, নাটক, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবা ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে।
একজন শিক্ষক কখনো কখনো একটি শিশুর জীবনে একটি বইয়ের চেয়েও বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। একটি উৎসাহের বাক্য, একটি বিশ্বাস, একটি ভুল ক্ষমা করার মানসিকতা—এসব শিশুর আত্মবিশ্বাস ও চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকের কাজ শুধু উত্তর শেখানো নয়; কখন প্রশ্ন করতে হবে, কখন অন্যকে শুনতে হবে এবং কখন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে—সেটিও শেখানো।
সরকারের দায়িত্বও শুধু ক্ষতিকর কনটেন্ট বন্ধ করা নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ডিজিটাল ও মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশু যেন বুঝতে শেখে—ইন্টারনেটে পাওয়া প্রতিটি তথ্য সত্য নয়, প্রতিটি ছবি বাস্তব নয় এবং প্রতিটি জনপ্রিয় মত অনুসরণ করার মতো নয়। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি আসতে হবে আমাদের চিন্তায়।
আমরা সন্তানকে শুধু চাকরির বাজারের জন্য তৈরি করতে পারি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভবিষ্যতের অনেক কাজই বদলে যাবে। যন্ত্র হয়তো দ্রুত হিসাব করতে পারবে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে, এমনকি অনেক সৃজনশীল কাজও করতে পারবে। কিন্তু সহমর্মিতা, বিবেক, নৈতিক সিদ্ধান্ত, ভালোবাসা ও মানুষের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা—এসবই মানুষকে আলাদা করে রাখবে।
তাই আগামী দিনের শিক্ষা শুধু ‘কী জানে’ তা নয়; ‘কীভাবে ভাবে’, ‘কীভাবে আচরণ
করে’ এবং ‘অন্য মানুষের জন্য কী করে’—সেটিও মাপবে।
আমাদের সন্তান যেন শুধু সফল মানুষ না হয়, ভালো মানুষও হয়। সে যেন প্রতিযোগিতায় জিততে শেখে, আবার প্রয়োজনে অন্যকে জিততেও দিতে শেখে। সে যেন নিজের অধিকার বোঝে, আবার অন্যের অধিকারকেও সম্মান করে। সে যেন প্রযুক্তি ব্যবহার
করে পৃথিবীকে জানে, কিন্তু নিজের শিকড়কে ভুলে না যায়।
একদিন এই শিশুরাই আমাদের জায়গা নেবে। তারা ব্যাংক চালাবে, হাসপাতাল পরিচালনা করবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, নতুন প্রযুক্তি তৈরি করবে, সমাজের সিদ্ধান্ত নেবে। আজ তাদের হাতে আমরা যে মূল্যবোধ তুলে দেব, আগামী দিনের সমাজ অনেকটাই তার প্রতিফলন হবে।
তাই প্রশ্নটি শুধু—‘সন্তান কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে?’—এখানে থামলে চলবে না।
প্রশ্ন করতে হবে—সে কতক্ষণ বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলছে? কতক্ষণ বই পড়ছে? কতক্ষণ খেলছে? কতক্ষণ প্রকৃতিকে দেখছে? কতক্ষণ অন্যের কথা শুনছে? কতক্ষণ নিজের ভেতরের মানুষটির সঙ্গে কথা বলছে?
শিশুর শৈশবকে শুধু স্ক্রিনের আলোয় বড় হতে দেওয়া যাবে না। তার চোখে দেখতে হবে আকাশ, হাতে থাকতে হবে বই, পায়ে থাকতে হবে মাঠের মাটি, মনে থাকতে হবে স্বপ্ন আর হৃদয়ে থাকতে হবে মানুষের জন্য জায়গা।
কারণ আমরা শুধু একটি দক্ষ প্রজন্ম চাই না; আমরা চাই এমন একটি প্রজন্ম, যার জ্ঞান পৃথিবীকে এগিয়ে নেবে আর যার মানবিকতা পৃথিবীকে একটু সুন্দর করবে।
সন্তানের হাতে প্রযুক্তি থাকুক—কিন্তু তার মন যেন প্রযুক্তির দখলে না যায়। তার জীবন হোক আধুনিক—কিন্তু হৃদয় হোক মানবিক। আর তার শৈশব—ফিরে পাক একটু আকাশ, একটু মাঠ, একটু বই এবং অনেকটা ভালোবাসা।
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক



