মানুষের মুক্তি আসে না কোনো সংগ্রামেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী তৎপরতা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল, তার একটা আভাস পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম ও খুন হওয়ার ঘটনাগুলো থেকে। যারা খুন হয়েছেন তাদের খবর তো পাওয়াই যায়নি; গুম হওয়ার পর প্রাণ হাতে নিয়ে যারা ফিরে এসেছেন, তাদের মনেও আবার অপহৃত হওয়ার ভীতি এমন প্রবল করে দেওয়া হয়েছিল যে তাদের কেউই মুখ খোলার সাহস পাননি, কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে আসাকেও নিরাপদ বোধ করেননি। নির্যাতনের ঘটনাগুলো যারা ঘটাত, তারা ছিল প্রধানমন্ত্রীর খাস নিয়ন্ত্রণে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সক্রিয়তার বিষয়ে যে গুঞ্জন ছিল, সেটা যে অপপ্রচার নয়, বাস্তবিক সত্য, তাও প্রকাশ পেয়েছে। সরকার পরিবর্তন নির্বাচনের মাধ্যমে বিনা রক্তপাতেই ঘটতে পারত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটা হতে দেননি। প্রাণহানি ঘটেছে অকল্পনীয় মাত্রায়; শিশু ও নারীরাও বাদ পড়েনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প হত্যা করেছেন ভিন দেশের মানুষদের, আর ওই সরকারের লক্ষ্যবস্তু ছিল তার নিজের দেশের মানুষ, ভোট দিয়ে যারা তাকে শাসনক্ষমতায় বসিয়েছেন বলে তাদের দাবি। এর বাইরে নিষ্ঠুরতার বেলায়, ট্রাম্পে-হাসিনাতে পার্থক্য করা সহজসাধ্য নয়।
দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত ক্ষুদ্র আমাদের এই দেশ; এখানে আমরা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করেছি স্বাধীনতার এবং মুক্তির জন্য; পরিণামে যা পেয়েছি, সেটা গোলামির ওই পুঁজিবাদীদের ব্যবস্থাই। আমাদের জন্যও উন্নতি মানে ওই ব্যবস্থার ভেতরে বন্দি অবস্থায় উন্নত হওয়া। আমাদের দেশেও নির্বাচন হয়; কিন্তু তাতে জেতে কারা? হারই বা কাদের? প্রতিটি নির্বাচনেই কারা যে হারবে, সেটা পূর্বনির্দিষ্ট থাকে। জানা থাকে যে যারাই জিতুক, হারবে জনসাধারণ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সেটাই নিয়ম; আমেরিকায় যা ঘটে, বাংলাদেশেও সেটাই ঘটে থাকে। জয়ী হয় টাকাওয়ালারা; তাদের নাম ভিন্ন, কিন্তু পরিচয় অভিন্ন। তারা বিত্তবান ও সুবিধাভোগী। আমাদের দেশটা গরিব হলেও দেশের শাসনকর্তারা বুর্জোয়াই; গরিব দেশের ধনী বুর্জোয়া। নির্বাচনে নানা রকম কারসাজির আশ্রয় নিয়ে বুর্জোয়াদের যে দলটি ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হয়েছে, তারা ধাপে ধাপে নিজেদের সুবিধার বৃদ্ধিকরণের এবং বঞ্চিত মানুষের বঞ্চনাকে দুঃসহ করে তোলার কাজে হৃদয়হীনভাবে তৎপর ছিল।
প্রতিটি নির্বাচনেই কারা যে হারবে, সেটা পূর্বনির্দিষ্ট থাকে। জানা থাকে যে যারাই জিতুক, হারবে জনসাধারণ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সেটাই নিয়ম; আমেরিকায় যা ঘটে, বাংলাদেশেও সেটাই ঘটে থাকে
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির যে অংশের শাসনের পতন ঘটেছে, সে অভ্যুত্থানের সূত্রপাত জনসাধারণ বা তাদের পক্ষের কোনো রাজনৈতিক দল ঘটায়নি। ঘটিয়েছে ছাত্ররা। যাদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছিল, তার অবসান ঘটানোর। ফ্যাসিবাদী সরকার কোনো আন্দোলনই সহ্য করতে প্রস্তুত ছিল না; ছাত্রদের আন্দোলন যখন প্রবল হয়ে উঠল, তখন তাকে দমনে সরকার যে ধরনের নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়, তাতে আন্দোলন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। বঞ্চিত মানুষের বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল, সেটি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সাংস্কৃতিক কর্মীরাও যোগ দেন। দ্রোহযাত্রায় অসংখ্য মানুষ অংশ নেয়। ফলে আমাদের ইতিহাসে যেটা কখনো ঘটেনি, সেটাই ঘটে গেছে; প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন। তার সাঙ্গোপাঙ্গ ও চেলাচামুণ্ডাদের অনেকেই প্রথমে গা ঢাকা দিয়ে পরে সীমান্ত পার হয়ে বিভিন্ন দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। নিয়ম এটাই যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতন ও হুমকি-ধমকির মুখে সমাজবিপ্লবীরা হয় আত্মগোপন করবেন, নয়তো কারাবন্দি হবেন; এবার দেখা গেল উল্টো ঘটনা, রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া প্রধানমন্ত্রীই দেশত্যাগ করছেন। তবে তাতে করে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার যে পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয় ছিল, সেটা যে ঘটেছে, তা নয়। রাষ্ট্রব্যবস্থা আগের মতোই পুঁজিবাদী চরিত্রেরই রয়ে গেছে।
জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্রত্যক্ষে সুসংগঠিত কোনো নেতৃত্ব ছিল না। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন ছাত্রনেতাকে যে ‘মাস্টার মাইন্ড’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেটি হয়তো ভ্রমবশতই ঘটেছে; কেননা অভ্যুত্থানের পেছনে অমন কোনো ‘মাইন্ড’ যে কাজ করেনি, সেটা জ্ঞাত সত্য। ‘মাস্টার মাইন্ড’ তো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে প্রয়োজন হয় না, দরকার পড়ে ষড়যন্ত্রে; জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান কোনো ষড়যন্ত্রের ফসল নয় তো! স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পরিণতি সাদা চোখে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। তবে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তাদের তিনজন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হওয়ায় এবং অন্যদের হাতেও অপ্রত্যাশিত পরিমাণ ক্ষমতা চলে আসায় নেতৃত্বদানকারীদের ভেতর রাজনৈতিক দল গঠন করে প্রাপ্ত ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার ইচ্ছাটা যে জেগে উঠেছিল, এটা খুবই স্বাভাবিক।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করার সময় নেতাদের মধ্যে উচ্চমাত্রায় আত্মবিশ্বাস দেখা দিয়েছিল, নইলে এক নিঃশ্বাসে এমন ঘোষণা তারা জারি করেন কী করে যে তাদের পার্টি তিনশ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরে বাস্তব অবস্থা তাদের সংযত করেছে এবং শিখিয়েছে যে আলাদাভাবে না দাঁড়িয়ে বড় দুই দলের একটির সঙ্গে আসন সমঝোতায় আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তখন তারা সে উদ্যোগই নিয়েছে। বড় দল তো দুটি, বিএনপি এবং তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী। ছাত্রনেতারা উভয় দলের সঙ্গেই দরকষাকষি করেছেন। বিএনপি প্রকাশ্যে আন্দোলন করা, জুলুম নির্যাতন, কারাভোগ, গুম, খুন সহ্য করা পুরনো দল; নির্বাচন হলে তারাই সরকার গঠন করবে— এমন আত্মবিশ্বাস বিএনপির ছিল; তদুপরি এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে একসময়ের বামপন্থী কয়েকটি দল জোটবদ্ধ হয়েছে, যাদের অল্প হলেও কিছু আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে, সেক্ষেত্রে সদ্যগঠিত একটি দলের জন্য প্রশস্ত অবস্থানের ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না। ছাত্রনেতাদের সদ্যগঠিত দল তখন জামায়াতের দ্বারস্থ হয়। জামায়াতের দিক থেকে তরুণদের সঙ্গে পাওয়াটা প্রয়োজন ছিল; শুধু যে দল ভারী করার জন্য তা নয়, অতীতের কলঙ্ককে আড়াল করার কাজে সহায়তার জন্যও। বলার আবশ্যকতা নেই যে জামায়াত খুব বড় আকারে ছাড় দেবে— এমন আশা ছিল নিতান্তই অবাস্তব। তবে শেষ পর্যন্ত ত্রিশ আসনে সমঝোতা হয় বলে জানা যায়। অভ্যুত্থানে সফল হয়ে ছাত্রনেতারা নতুন ধরনের রাজনীতি উপহার দেবেন— এমন আশা জাগানোর পর তাদের দল অতিশয় পুরনো (নানা দিক থেকে) একটি দলের সাহায্যপ্রার্থী হবে— এমনটা দেশের মানুষ তো বটেই, সংগঠনের ভেতরেরও অনেকেই আশা করেননি। নতুন দলের একাংশ, বিশেষ করে মেয়েরা প্রতিবাদ করেছে; বিচ্ছিন্ন এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে; কিন্তু প্রধান অংশ তাদের শাপলা কলি প্রতীকের জন্য জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় জায়গা খুঁজে নেওয়াটাকেই বাঞ্ছনীয় ভেবেছে। এই রকমের পরিণতি যে অপ্রত্যাশিত ছিল, তা অবশ্য বলা যাবে না। কারণ, এনসিপি সমাজবিপ্লবী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, দলটির তারুণ্যের ভেতর রক্ষণশীল এবং দক্ষিণপন্থী উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে বৈকি।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির মিলন অস্বাভাবিক না হলেও জামায়াতের নব উত্থান কিন্তু বিস্ময়কর। যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তারা সম্ভব অসম্ভব সব কিছুই করেছে, কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পথেও এগোয়নি; যে দল তার আদি জন্মভূমি ভারতে বিলুপ্তই হয়ে গেছে এবং বিশিষ্ট কর্মভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্রে যাদের অস্তিত্ব এখন প্রান্তিক পর্যায়ে, সেই দল স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থান দখল করে নেবে— এই ঘটনা বিস্ময়কর তো বটেই; আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্যই। যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনাস্থল ও লালনভূমি, চিন্তা ও মননশীলতার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার জন্য যাদের ছিল বিশেষ খ্যাতি, সেখানে জামায়াতপন্থী ছাত্ররা আধিপত্য বিস্তার করবে— এমনটা ২০২৬ সালের আগে কল্পনা করাও ছিল দুঃসাধ্য। অথচ সেটাই ঘটেছে। হয়তোবা জামায়াতের চাপেই নবগঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শোক প্রস্তাবে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জামায়াতের এই উত্থানের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




