আমার সাবল্টার্ন বক্তৃতা

লেখক ও চিত্রনাট্যকার শিবব্রত বর্মন
কিছুদিন ধরে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে ‘সাবল্টার্ন’ নামক একটি শব্দে। আমরা যাদের বুদ্ধিজীবী বলে চিনি, তাদের প্রায় সবাই এ বিষয়ে কিছু না কিছু বলছেন।
আমি একটু বিপন্ন বোধ করলাম। এমনিতে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে আমার প্রবল আলস্য। তার ওপর আমার চিন্তার গতি শ্লথ। আশপাশে কোথা থেকে কী ঘটে যাচ্ছে, ঠিকমতো অনুসরণ করতে পারি না। প্রথমটায় ভাবলাম এড়িয়ে যাই। দুদিন পর নতুন কোনো সহজ প্রসঙ্গে মাতামাতি শুরু হলে তাতে না হয় মনোযোগ দেব।
এদিকে বিশ্বকাপ চলছে। মেসি-রোনালদো তর্ক দিয়ে একটি মাস তালেগোলে পার করে দিতে পারব। কিন্তু সপ্তাহ পেরিয়েও সাবল্টার্নবাজি থামছে না। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের রণহুংকারও চাপা পড়ে যাচ্ছে ফেসবুকে সাবল্টার্ন, হেজিমনি, গ্রামসি, গায়ত্রী, ফুকো, দেরিদা— ইত্যাদি শব্দের ঝনঝনানিতে।
আমি সামাজিক প্রাণী। রাস্তাঘাটে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে ফুটপাতের পাশে চায়ের আড্ডায় মেতে উঠি। সেখানে আলোচনা কোনোভাবে একবার ফুটবল প্রসঙ্গের বাইরে চলে গিয়ে সাবল্টার্নে ঢুকে গেলে যাতে বেকায়দায় না পড়ি এবং আমার অজ্ঞতার গোমর যাতে ভরা মজলিসে ফাঁস হয়ে না যায়, সেই ভয়ে গোপনে প্রাথমিক খোঁজখবর করে দেখি, সবাই আসলে তর্ক করছে ‘সাবল্টার্ন’ নামক মানুষরা কথা বলতে পারে কি না, তা নিয়ে। এ-ও স্পষ্ট বুঝলাম, কথা বলতে না পারার এ সমস্যা সাবল্টার্নদের নাক-কান-গলাবিষয়ক কোনো শারীরিক সমস্যা নয়। তবে এটা যে ঠিক কোন ধরনের সমস্যা, আলোচনা থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল না।
যতটুকু বুঝলাম, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি সার্কেলে সাদিক কায়েম ও হাসনাত আবদুল্লাহর কী এক বক্তব্য ঘিরে এ তর্কের সূত্রপাত। তারা নাকি নিজেদের সাবল্টার্নদের প্রতিনিধি দাবি করেছেন। দেশের মাটিতে দাবি করলে না হয় একটা কথা ছিল। বিদেশের মাটিতে, বিশেষ করে অক্সফোর্ডের মতো একটা প্রেস্টিজিয়াস জ্ঞানালয়ে গিয়ে এ কথা বলে আসা কি তাদের ঠিক হয়েছে? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, কাজটা ঠিক হয়েছে কি না। কিন্তু ঢাকায় দেখি প্রবল প্রতিক্রিয়া। আর তাতে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নামের এক বিদুষী নারীর প্রসঙ্গ এসে পড়েছে, যিনি কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। আগেও এসেছিলেন একাধিকবার।
গায়ত্রী চক্রবর্তীর নাম আমার কাছে নতুন নয়। বিনয় মজুমদার নামে আমাদের এক অতি আদরের কবির সূত্রে এ নাম আমাদের শোনা। বিনয় নাকি একদা কলকাতার কফি হাউজের আড্ডায় নিয়মিত আসা তরুণী গায়ত্রীর একতরফা প্রেমে পড়েছিলেন। বিনয়ের ‘ফিরে এসো চাকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘চাকা’ শব্দের মূলে নাকি আছে চক্রবর্তী, মানে গায়ত্রী চক্রবর্তী। ওই নারী আমেরিকায় পড়তে যাওয়ায় বিরহকাতর গরিব আর পাগলাটে কবির আর্তি ছিল ওই কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম।
নিজেকে আড্ডার জন্য প্রস্তুত করতে আমি গায়ত্রী, দেরিদা, ফুকো, হেজিমনি, কাউন্টার হেজিমনি ইত্যাদি ঘাঁটতে শুরু করলাম। দু-তিন দিনের ক্রাশ কোর্স। দেখি কোনো কিছুতেই দাঁত বসাতে পারছি না। রাত জেগে এসব পড়ে আর বিশ্বকাপের খেলা দেখে আমার মাথায় সবকিছু কেমন গুবলেট পাকিয়ে গেল। ঘুম আর জাগরণের ভেতরে দোল খেতে খেতে যখন মনে হতে শুরু করল সাবল্টার্নরা কেন কথা বলতে পারে না, এ গুহ্য রহস্য আমি প্রায় ভেদ করে ফেলেছি— তখন শুনি বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, কারা এই সাবল্টার্ন, সেটাই নাকি এখনো সাব্যস্ত হয়নি। আলোচনা ততক্ষণে ঘুরে গেছে সাবল্টার্ন শনাক্ত করার তর্কে। বুঝলাম, তারা এতক্ষণ গাছের ডালে বসে থাকা সেই বিড়ালের হাসি নিয়ে কথা বলছিলেন, যে বিড়ালটাকে দেখা যাচ্ছে না। বিড়াল নেই, তাতে কী, তার হাসিখানা তো আছে।
ফলে এবার আমিও আমার ক্রাশ কোর্সের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলাম। কিন্তু ঘন ঘন দিকবদলের কারণে আমার পুরনো লোহালক্কড়ের গাড়ির কোথাও একটা তার ছিঁড়ে গেল। সেটা আমি টের পেলাম না। এমনকি সন্ধ্যাবেলা আজিজের কোনায় চায়ের দোকানে সাবল্টার্ন বিষয়ে আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা আর সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা প্রবল আত্মবিশ্বাসী লেকচার দেওয়ার সময় বিস্ময়ে আমার বুদ্ধিজীবী বন্ধুদের মুখ হাঁ হয়ে গেলেও আমি কিছুই আঁচ করতে পারিনি। আমি ভেবেছি, আমার বক্তব্যের গভীরতা, মৌলিকতা এবং সারবত্তা তাদের মুগ্ধ করেছে।
আমার কপাল ভালো। আমার ওই বক্তৃতা এতই জটিল আর জ্ঞানগর্ভ ছিল যে, আমি তার প্রায় পুরোটাই ভুলে গেছি। কিন্তু আমি ভুলে গেলে কী হবে, পরদিন থেকে এটা চায়ের দোকান ছাড়িয়ে দিকে দিকে, জনে জনে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। শুনলাম, ওই আড্ডায় আমি নাকি দাবি করেছি, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষকদের প্রতি এমন এক যন্ত্র বানিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় আদেশ জারি করা হোক, যে যন্ত্র দিয়ে ডিটেক্ট করা যাবে, কে সাবল্টার্ন আর কে নয়। এ নিয়ে যাতে কোনোরকম কনফিউশন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রে এ বিষয়ে উল্লেখ থাকতে পারে। তা ছাড়া সাবল্টার্নরা কথা বলতে পারলে সেটার আওয়াজ যতই ক্ষীণ হোক না কেন, তা ঠিকমতো রেকর্ড করতে একটি উন্নতমানের শব্দধারক যন্ত্র যাতে তৈরি করা যায় বা বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়, সে বিষয়ে সমাজের স্বীকৃত প্রেশার গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করার কথা আমি নাকি জোরগলায় দাবি করেছি।
আরও শুনি, আমি নাকি দাবি করেছি, দেশে শিগগির একটি সাবল্টার্ন মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর খোলা হোক, যাদের কাজ হবে নাগরিকদের এপিস্টেমিক ভায়োলেন্সের আতঙ্ক দূর করা, নিওলিবারেল ইলেকট্রিসিটি চালু করা, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাউন্টার হেজিমোনিক কনশাসনেসের প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে হারমেনিউটিক কফিশপকে উৎসাহিত করা।
আমি ঠিক নিশ্চিত নই, এগুলো পুরোপরি অপপ্রচার বা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কি না। কারণ, ওই বক্তৃতার কিছুই আমার মনে নেই। আগের দুই রাতের নির্ঘুম চোখের কারণে আমি কিছুটা ঘোরগ্রস্তই ছিলাম। ভাবলাম, পরবর্তী দুই রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারলে ঘোর কেটে যাবে। কিন্তু দুটি দিন বেঘোরে ঘুমানের পর সকালে পত্রিকা খুলে লিড নিউজ দেখে আতঙ্কে পড়ে গেলাম। বুঝলাম, এই ঘোর থেকে আমি এখনো বের হতে পারিনি। আদৌ আর বের হতে পারব কি না, কে জানে। লিড নিউজে লেখা: ‘রাজধানীর মিরপুরে এক সাবল্টার্ন কথা বলে উঠেছে।’




