নারী ফুটবলে আলোর দিশারি মফিজ উদ্দিন

কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ চলছে মফিজ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে। ২০১৬ সালের ছবি। ছবি : আগামীর সময়
ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের সবুজ, ছায়াঘেরা কলসিন্দুর গ্রামের কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেশের নারী ফুটবলার তৈরির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
স্কুলটির মেয়েদের খেলার খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ জুড়ে। সেই ছোট্ট মেয়েরা এখন কিশোরী, তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। আজ তাদের পথচলা আগের চেয়ে অনেকটাই মসৃণ।
কিন্তু শুরুর দিকে তাদের পাশে তেমন কেউ ছিলেন না। এমনকি অনেকের পরিবারের পক্ষ থেকেও বাধা এসেছিল। সেই কঠিন সময়ে মেয়েদের ফুটবল খেলায় নিয়ে এসেছিলেন, তাদের পাশে ছিলেন কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মফিজ উদ্দিন।
অভাব, অপুষ্টি, সামাজিক বাধা, এবড়োখেবড়ো মাঠ— সবকিছু তুচ্ছ করে মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ আর উৎসাহ দিয়ে সাফল্যের মশালে প্রথমে আলো জ্বালিয়েছিলেন মফিজ উদ্দিন।
মফিজ উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০০১ সালে তিনি কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ড কাপ টুর্নামেন্টে ছেলেদের টিম নিয়ে উপজেলা সদরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেলা সদরে ফুটবল খেলতে যান। কিন্তু জেলা সদরে অন্য স্কুলের সঙ্গে হেরে যায় তার টিম।
২০১০ সালের দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মফিজ উদ্দিন ভাবলেন, মেয়েদের নিয়ে সাফল্য আসতে পারে। তিনি কথা বললেন প্রধান শিক্ষক মিনতি রানীর সঙ্গে। প্রধান শিক্ষক সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। গামারিতলা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ওই সময়ের সদস্য আবদুল কাদেরসহ অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়ালেন। আবদুল কাদেরের সঙ্গে অভিভাবকদের ভালো যোগাযোগ ছিল। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও মেয়েদের ফুটবল খেলার বিষয়ে বোঝালেন।
কিন্তু যাত্রাপথ এত সহজ ছিল না। খেলার জন্য ফুটবল ছিল না। মেয়েরা ক্লাস শেষে বাড়ি গিয়ে আর প্র্যাকটিসে আসতে চাইত না। অনেক মা-বাবা রাজি ছিলেন না। শুরুতে নিজেই একটি ফুটবল কিনলেন মফিজ উদ্দিন। মেয়েরা আসতে না চাইলে তিনি তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে মাঠে নিয়ে আসতেন। অধিকাংশ মেয়ের পরিবারই ছিল গরিব। তাদের নাশতার টাকাও ছিল না। স্কুলের বাড়তি কিছু টিফিন প্র্যাকটিসে আসা মেয়েদের দেওয়া হতো। শুরু হলো স্কুলের প্রায় ৩০ মেয়ে শিক্ষার্থী নিয়ে ফুটবলের যাত্রা।
সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করছিলেন মফিজ উদ্দিন, ‘ফুটবল খেলার জন্য মেয়েদের আলাদা পোশাক ছিল না। সালোয়ার-কামিজ পরেই তারা খেলত। যখন তারা টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে উপজেলায় চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন তাদের পোশাকের ব্যবস্থা হলো। এরপর বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০১১ ও ২০১২ সালে ঢাকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে হয় জাতীয় চ্যাম্পিয়ন।’
মফিজ উদ্দিন জানালেন, ওই স্কুলের ১৬-১৭ জন মেয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলেছেন। এখনো পাঁচজন আছেন জাতীয় দলে। মেয়েরা আজও বড় কোনো প্রতিযোগিতায় নামার আগে তার কাছে ফোন করে দোয়া চান। মফিজ উদ্দিন ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক পদে বদলি হয়ে ধোবাউড়া উপজেলারই রনসিংহপুর প্রাইমারি স্কুলে চলে আসেন।
মফিজ উদ্দিনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের সদস্য তহুরা, ‘তখন ক্লাস টুতে পড়তাম। স্কুল শেষে বাড়ি চলে যেতাম। অনেক সময় স্যার বাড়িতে গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে আমাকে সাইকেলে চড়িয়ে মাঠে নিয়ে আসতেন। স্যারের কারণেই আজকে এ অবস্থায় পৌঁছেছি।’
জাতীয় নারী ফুটবল দলের আরেক সদস্য মারিয়া মান্দা বললেন, ‘স্যারের উৎসাহে ফুটবল খেলার জগতে আসি। স্যারের অবদানের কথা কখনো ভুলব না।’




