সম্রাট জেলে সাম্রাজ্য কার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমাদের এই আঠারো কোটি মানুষের রাষ্ট্রে প্রায় বিরাশি লাখ শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী, পুরুষ ও বয়স্ক মানুষ মাদকাসক্তির করাল গ্রাসে পতিত হয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অথচ সরকারের একটি শক্তিশালী মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশাল রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়, সুরম্য অফিস-ভবন, লজিস্টিক সাপোর্ট আর বিপুল লোকবল নিয়ে পরিচালিত মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এক অপদার্থ সংস্থায় পরিণত হয়ে গণমানুষের তীব্র নিন্দা কুড়াচ্ছে। সারা দেশে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের এই চরম অসহায় দশা এবং পারিবারিক হাহাকার দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু এই প্রতিকারহীন পরিস্থিতি সমগ্র দেশবাসীকে গভীর হতাশা এবং এক অন্তহীন আর্তনাদের অন্ধকূপে নিক্ষেপ করেছে।
মিয়ানমার সীমান্তে টেকনাফের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক কারবারিরা কক্সবাজার-টেকনাফ রুটটিকে নিরাপদ প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। নাফ নদ এবং দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ংকর মাদক দেশে প্রবেশ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সময়ে তৈরি করা তালিকায় টেকনাফ ও কক্সবাজারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম মাদকের গডফাদার বা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উঠে এসেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তিনি হলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার অন্যতম এই প্রিয়পাত্র নিজে, তার সহধর্মিণী, ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজন মিলে গত তিন-চার দশকে কমপক্ষে একশ জনের এক ভয়ংকর মাদক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার মাদক চোরাচালানের তালিকার শীর্ষে বারবার এই বদির নাম এসেছে। তার নিজের ভাই আবদুল শুক্কুর, আবদুল আমিন, মো. ফয়সাল, শফিকুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সরাসরি এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। এমনকি ২০১৯ সালে টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে যে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাদের মধ্যেও বদির ভাই ও আত্মীয়রা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা পরে জামিনে বের হয়ে আবার আত্মগোপনে চলে যান। অভিজ্ঞজনের ধারণা, এই বদি ও তার সহযোগী মাদকসম্রাটরা এই কুপথে কমপক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকার অবৈধ বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছে। কক্সবাজারের আপামর জনগণ জানে, নাফ নদের এপারে-ওপারে মিয়ানমারে বদির নিজস্ব মাদক তৈরির কারখানা ও বিশাল বাজার রয়েছে। এই মাদক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে ইয়াবা, আইস ও অন্যান্য অবৈধ মাদকের যে চোরাচালান চলছে, তা আজ বিশ্বকুখ্যাতি লাভ করেছে।
এই মাফিয়া সম্রাট শেখ হাসিনার এতটাই অন্ধ অনুগ্রহভাজন ও প্রিয়পাত্র ছিলেন যে, তীব্র মাদক-সংক্রান্ত বিতর্ক ও নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে যখন দলীয় মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি, তখন লোকলজ্জা উপেক্ষা করে আরেক মাদকসম্রাজ্ঞী মিসেস বদিকে মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়ে ছাড়লেন হাসিনা।
মাদকের সিংহভাগই দেশের ভেতরে আসক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এই মাদক মাফিয়া চক্রের শীর্ষ খলনায়ক বা গডফাদার হিসেবে উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও তার পরিবারের নাম বারবার সামনে আসে
কোটি কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে স্থানীয় রাজনীতিক থেকে শুরু করে একশ্রেণির আমলা-কামলা সবাই এই চক্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে এবং বদি-গোষ্ঠীর পক্ষে সাফাই গেয়ে সব মামলা থেকে তাদের বাঁচিয়ে দেয়। ফলে আইনের মাধ্যমে এই মাফিয়াদের ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সারা দেশে এবং কক্সবাজারের মাদক মাফিয়ারা এই বিচারহীনতার সুযোগ ও সুফল বুক ফুলিয়ে ভোগ করছে। অবশ্য এর আগে ২০১৬ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় আদালত বদিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন, যদিও পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকা থেকে র্যাব বদিকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে উখিয়া-টেকনাফে হামলা, ভাঙচুর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সহিংসতায় অর্থায়নের অভিযোগে মামলা করা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট থেকে তিনি এসব মামলায় জামিন পেলেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ সেই জামিন স্থগিত রাখেন। এ ছাড়া টেকনাফের স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের একটি মামলাসহ আরও বেশ কিছু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি যাচ্ছেন।
প্রকৃতপক্ষে, আমাদের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বিশাল অংশ একদিকে যেমন নিজে ‘ঘুষ বাণিজ্যে’ সরাসরি জড়িত, অন্যদিকে সৎ কর্মকর্তারা আবার নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে সবসময় সন্ত্রস্ত থাকেন। স্বৈরাচার এরশাদ আমলের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। সে সময় বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরে হঠাৎ শোরগোল পড়ে গেল যে, চোরাকারবারিদের কাছ থেকে একসঙ্গে ৪৪ কেজি মারাত্মক অবৈধ মাদক হেরোইন আটক হতে যাচ্ছে। তৎকালীন মাদক দপ্তরের বড় কর্তারা এটিকে নিজেদের এক বিশাল সাফল্য বলে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করতে লাগলেন। কিন্তু শেষাবধি দেখা গেল, সেই ৪৪ কেজি হেরোইন মূলত যাচ্ছিল যুক্তরাজ্যে এবং সেখানকার গোয়েন্দা সংস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই চালান মাঝপথে আটকে দেয়। সেখানে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তাদের ভূমিকা ছিল ১ শতাংশেরও কম। এভাবেই এ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা মিথ্যাচার আর সস্তা কৃতিত্ব জাহির করে নিজেদের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অকর্মণ্যতাকে ঢেকে রাখতে ভালোবাসেন।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী অবৈধ মাদক ব্যবসা আজ এক বিশাল সমান্তরাল বা ছায়া অর্থনীতি তৈরি করেছে, যার মূল্য প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের পাশেই অবস্থিত মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসকে নিয়ে গঠিত কুখ্যাত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল’ অঞ্চলে কৃত্রিম মাদক, বিশেষ করে মেথামফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথ এবং ইয়াবার উৎপাদন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তার জেনারেলরা সরাসরি এই ইয়াবা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত এবং তারা বাংলাদেশকে ট্রানজিট ও মূল বাজার হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলার অবৈধভাবে লুটে নিচ্ছে আর ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশ আজ মাদক পাচারের অন্যতম উত্তম রুট বা নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। বেসরকারি ও সামাজিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় চার লাখ কোটি টাকার অবৈধ মাদকের চোরাকারবার চলে। এই বিশাল মাদকের সিংহভাগই দেশের ভেতরে আসক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এই মাদক মাফিয়া চক্রের শীর্ষ খলনায়ক বা গডফাদার হিসেবে উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও তার পরিবারের নাম বারবার সামনে আসে।
লেখক: সংসদ সদস্য এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব





