লক্ষ্য শুধু অবকাঠামোই নাকি সক্ষমতা বাড়ানো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে কর্মসংস্থান প্রশ্নে আমরা একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব কমই করি— গত তিন দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, মহাসড়ক, মেট্রোরেল, হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের জন্য কতটা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করেছে? এ ধরনের বিনিয়োগের ফলে কি বাংলাদেশের প্রকৌশলী, গবেষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানাগুলোও শক্তিশালী হয়েছে, নাকি আমরা শুধু অবকাঠামোর মালিক হয়েছি?
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ইতিহাস বলছে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; সেই অবকাঠামোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্প, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ গড়ে তোলাও প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হয়, ঋণ শোধ হয়, কিন্তু প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা থেকে যায়।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা সাম্প্রতিক চীনের অভিজ্ঞতা দেখলে দেখা যায়, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, শিল্পনীতি, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং সরকারি ক্রয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে। দক্ষিণ কোরিয়া মেট্রোরেল নির্মাণকে শুধু পরিবহন প্রকল্প হিসেবে দেখেনি; প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। সেই ধারাবাহিকতার ফল হিসেবে আজ হুন্দাই রোটেম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেল প্রযুক্তি রপ্তানি করছে।
বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ এমন একটি খাতভিত্তিক উন্নয়ন মডেল, যেখানে সরকারি ব্যয়কে জাতীয় প্রযুক্তি সক্ষমতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এক্ষেত্রে একটি আট ধাপের কৌশলগত রূপরেখা বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রায়ই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি কোনো আলাদা কর্মসূচি নয়; এটি শিল্পায়নের ফল। একটি শক্তিশালী শিল্প-ইকোসিস্টেম গড়ে উঠলে কারখানায় চাকরি তৈরি হবে, নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হবে
১. রাষ্ট্র যখন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, তখন শুধু পণ্য বা সেবার মূল্য নয়, বরং সেই প্রকল্প দেশের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও শিল্পভিত্তি কতটা বাড়াবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ২. বড় প্রকল্পে দেশীয় প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেশে থেকে যায়। ৩. বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প এবং সরকারি প্রকল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে। ৪. বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার নয়, তা বুঝে পরিবর্তন ও উন্নত করার সক্ষমতা তৈরি করা। ৫. বিদেশি প্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে হবে। ৬. যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সেবার স্থানীয় উৎপাদন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারে। ৭. স্মার্ট সেচব্যবস্থা, কৃষি ড্রোন, কম খরচের মেডিকেল ডিভাইস, স্মার্ট মিটার কিংবা সরকারি অডিট সফটওয়্যারের মতো প্রযুক্তিপণ্য ভবিষ্যতের শিল্পভিত্তি হতে পারে। ৮. দেশীয় বাজারে সফলতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের পরই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সম্ভব।
বাংলাদেশ কি এই পথ একেবারেই চেনে না? উত্তর হলো— চেনে। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপ একসময় শুধু মেরামত কেন্দ্র ছিল না; এটি ছিল প্রকৌশল দক্ষতা গড়ে তোলার একটি বড় প্রতিষ্ঠান। সেখানে শত শত ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি হতো এবং বহু দক্ষ কারিগর, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি হয়েছেন। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের বিকাশেও এই দক্ষতার অবদান ছিল। কিন্তু এই ভিত্তির ওপর আমরা কেন পরবর্তী ধাপগুলো গড়ে তুলতে পারলাম না? কেন সৈয়দপুরকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেলশিল্প কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা সম্ভব হলো না?
গত দুই দশকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ রেল কোচ আমদানি করেছে। কোচ কেনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করা প্রয়োজন— এই ক্রয় থেকে আমরা কতটা প্রযুক্তি অর্জন করেছি?
বিদ্যুৎ খাতেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। বাংলাদেশে প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার স্থাপনের একটি বিশাল কর্মসূচি চলছে। ধরা যাক, আগামী বছরগুলোতে দেশে ৪ কোটি প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হবে। প্রতিটি মিটারের গড় মূল্য যদি ১০ হাজার টাকা ধরা হয়, তাহলে এই বাজারের আকার দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, আমরা এই ৪০ হাজার কোটি টাকাকে কীভাবে দেখব? ক্রয় কর্মসূচি হিসেবে? নাকি শিল্প উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে?
অনেকে মনে করেন, স্মার্ট মিটার মানেই বিদেশ থেকে একটি প্রস্তুত পণ্য এনে দেশে স্থাপন করা। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি বিস্তৃত। একটি আধুনিক স্মার্ট মিটারের মধ্যে থাকে ইলেকট্রনিক সার্কিট, যোগাযোগব্যবস্থা, সফটওয়্যার, ডেটা ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উপাদান। এর বড় একটি অংশ বাংলাদেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। অর্থাৎ এটি শুধু একটি মিটার প্রকল্প নয়; এটি ইলেকট্রনিকস শিল্প, এমবেডেড সফটওয়্যার, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি, সার্কিট বোর্ড উৎপাদন এবং ডেটা ম্যানেজমেন্ট সেবার একটি সম্ভাব্য ভিত্তি।
আজ আমরা যদি শুধু বিদেশি মিটার কিনি, তাহলে কয়েক বছর পর আবার নতুন মিটার কিনতে হবে। কিন্তু এই বাজারকে ব্যবহার করে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সক্ষম করে তুলি, তাহলে একই অর্থ থেকে নতুন শিল্প, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রযুক্তি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তির অভাব নয়; বরং দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। সৎ ও দক্ষ ক্রয়ব্যবস্থা, মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা, গবেষণাবান্ধব নীতি, শিল্পবান্ধব অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে প্রায়ই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি কোনো আলাদা কর্মসূচি নয়; এটি শিল্পায়নের ফল। একটি শক্তিশালী শিল্প-ইকোসিস্টেম গড়ে উঠলে কারখানায় চাকরি তৈরি হবে, সরবরাহ শৃঙ্খলে কাজ তৈরি হবে, গবেষণাগারে কাজ তৈরি হবে, প্রযুক্তিসেবায় কাজ তৈরি হবে, এমনকি নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশের সামনে আগামী দশকে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে যাওয়ার যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোর উত্তর হয়তো নতুন কোনো স্লোগানে নেই। বরং উত্তরটি লুকিয়ে আছে একটি সহজ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণায়— উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অবকাঠামো তৈরি করবে না; উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশও গড়ে উঠবে। অবকাঠামো থেকে প্রযুক্তি, প্রযুক্তি থেকে শিল্প, শিল্প থেকে কর্মসংস্থান— এই ধারাবাহিকতাই হতে পারে আগামী বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা। আমরা কি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করব, নাকি অবকাঠামোর মাধ্যমে একটি সক্ষম জাতিও গড়ে তুলব?
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন




