১ টাকার শিক্ষক লুৎফর রহমান

এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান -আগামীর সময়
গাইবান্ধার এক নিভৃত পল্লীতে বাতিঘরের মতো আলো জ্বালছেন ৭৮ বছর বয়সী লুৎফর রহমান। ৫০ বছর ধরে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে পাঠদান করে আসছেন তিনি। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় এলাকাবাসী তাকে ডাকেন ‘১ টাকার শিক্ষক’ বলে।
সম্প্রতি এক সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মদনেপাড়া গ্রামে মিনারা বেগমের বাড়ির উঠানে চোখে পড়ে অন্যরকম এক দৃশ্য। প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে তার ওপর গোল করে বসে আছে একদল শিশু, আর হাত নেড়ে নেড়ে তাদের পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষক লুৎফর। এই দৃশ্যে যেন মিশে আছে শিক্ষক জীবনের নিষ্ঠা আর কঠিন সাধনা।
লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মধ্য উড়িয়া গ্রামে। ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করলেও চরম দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে যায় তার। সেই বেদনা থেকেই শপথ নিয়েছিলেন এলাকার গরিব ও ছিন্নমূল শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হয় তার পথচলা।
স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে লুৎফরের সংসার। তিনি সপরিবারে বসবাস করেন গাইবান্ধা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামের একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে। বড় ছেলে ইজিবাইক চালান। নদীভাঙনে তার পরিবার হারিয়েছে সবকিছু। তবু থেমে নেই তিনি। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিশুদের ডেকে আনেন তিনি। বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় প্রতিদিন ৭০-৮০ শিক্ষার্থীকে পড়ান। বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিদিন নেন মাত্র ১ টাকা।
লুৎফর রহমান বললেন, ‘১৯৭৫ সালে যখন শুরু করি তখন বিনা পয়সায় পড়াতাম। পরে অভিভাবকদের অনুরোধে ১ টাকা করে নেওয়া শুরু করি। আজ ৫০ বছর পরও সেই ১ টাকাই নিচ্ছি। টাকা আমার কাছে বড় নয়, দরিদ্র শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।’
তার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই হয়েছেন ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকার ও পুলিশ সদস্য।
লুৎফর রহমানের ছাত্র ছিলেন সদর উপজেলার দারুল হুদা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বললেন— ‘শিক্ষক লুৎফর রহমানের কারণেই আমার মতো শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষার আলোর মুখ দেখেছে। সমাজে এমন নির্লোভ মানুষ সত্যিই বিরল।’
অভিভাবক সুলতানার ভাষ্য, ‘আমি নিজেও স্যারের কাছে পড়েছি, এখন আমার সন্তানও পড়ছে। এই যুগে এমন মানুষ পাওয়া সত্যিই কঠিন।’ গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু বললেন, ‘লুৎফর মাস্টার একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। সমাজ বদলাতে তার মতো নিবেদিত প্রাণের বড় প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো তার পাশে থাকার চেষ্টা করি আমরা।’
লুৎফর জানিয়েছেন, এ বছর ঈদুল আজহায় প্রধানমন্ত্রী তাকে উপহার দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা এবং পোশাক। প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে তিনি অনেক খুশি। তার প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী যেন শিশুদের পড়ানোর জন্য একটি ঘর করে দেন ও তার আবাসনের একটু ব্যবস্থা করে দেন।
৫০ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় সহস্রাধিক শিশুর জীবন আলোকিত করা লুৎফর রহমানের শেষ ইচ্ছা— তার ছাত্ররা যেন প্রকৃত মানুষ হয়ে দেশের কাজে লাগেন।




