‘শ্বেতহস্তী’র চাষ ও খাদ্যনিরাপত্তার বাস্তবতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাগুজে উন্নয়ন আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে যোজন যোজন ফারাক থাকে, বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর তীরে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার টিস্যু কালচার ল্যাব নির্মাণ প্রকল্প তা আবারও দেখিয়ে দিল। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক কৃষির প্রসারে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাত্ত্বিক কোনো বিতর্ক নেই। যেখানে দেশের কৃষিজমি দিন দিন কমছে এবং জনসংখ্যা বাড়ছে, সেখানে কম সময়ে কোটি কোটি রোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল চারা উৎপাদনের এই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি আমাদের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় যখন দেশের কৃষি বিপন্ন, তখন বন্যা বা খরা-সহনশীল জাতের দ্রুত বিস্তারে টিস্যু কালচার ল্যাবের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশাল অনাবাদি জমিকে উর্বর ও ফলনশীল করে তুলে তিন পার্বত্য জেলাসহ পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুষ্টি এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার যে স্বপ্ন এই প্রকল্পের প্রস্তাবনায় দেখানো হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে লোভনীয়। কিন্তু প্রশ্নটি প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নয়, প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচন এবং অতীতের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা নিয়ে।
পার্বত্য অঞ্চলের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ধসপ্রবণ এলাকায় নদীর তীর ঘেঁষে চারতলা ভবন তোলার আগে সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষার সঠিক তথ্য সাইট ইঞ্জিনিয়ারের কাছেই না থাকাটা এক চরম দায়িত্বহীনতার প্রমাণ। নদীর তীরে এমন ভারী স্থাপনা নির্মাণের ঝুঁকি নিয়ে যখন স্থানীয়দের মনে যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে, তখন নকশাকারীদের ওপর দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলার চেনা আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের উদ্বিগ্ন করে। এর আগে পার্বত্য এলাকার কৃষিপণ্য সংরক্ষণের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হিমাগারটির কথা উল্লেখযোগ্য। হিমাগারটি বছরের পর বছর অকার্যকর ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে এই নতুন প্রকল্পটিকেও ‘নতুন শ্বেতহস্তী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অতীতে ফল চাষ, কফি, কাজুবাদাম বা মসলা চাষের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প এসে পাহাড়ের মানুষের ভাগ্যের কতটা বদল ঘটিয়েছে, তা এক বিরাট রহস্য। অবকাঠামো নির্মাণের পর দক্ষ জনবল ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যদি ল্যাবটি বন্ধ হয়ে থাকে, তবে কোটি টাকার বিদেশি যন্ত্রপাতি শেষ পর্যন্ত ধুলোবালি আর মাকড়সার জালের আস্তানায় পরিণত হবে।
খাদ্যনিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এবং আধুনিকায়নের মোড়কে বিশাল বাজেটের প্রকল্প পাস করানো যতটা সহজ, মাঠপর্যায়ে তার টেকসই সুফল নিশ্চিত করা ততটাই কঠিন। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কিংবা দেশের অন্যান্য স্থানের ইতিবাচক উদাহরণ দিয়ে বান্দরবানের এই মহাপরিকল্পনার গলদগুলো ঢাকা যাবে না। প্রকল্প ব্যয়ের একটা বড় অংশ যখন যন্ত্রপাতি কেনা, পরামর্শক সেবা আর দেশ-বিদেশে প্রমোদভ্রমণ মার্কা প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়, তখন জনমনে সংশয় জাগাটাই স্বাভাবিক যে, এই ল্যাব কি আসলেই কৃষকের ভাগ্য ফেরাবে, নাকি ঠিকাদার আর আমলাদের পকেট ভারী করবে। যদি সত্যিই এই ল্যাবকে সফল করতে হয়, তবে শুধু ভবন নির্মাণেই বাহাদুরি শেষ না করে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা পদ্ধতি, দক্ষ বিজ্ঞানী নিয়োগ এবং পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে এর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, অতীতের মাশরুম বা হিমাগার প্রকল্পের মতোই সাড়ে ১৬ কোটি টাকার এই আধুনিক ল্যাবরেটরিও পাহাড়ের বুকে আরেকটি বিলাসী, অকার্যকর শ্বেতহস্তী হিসেবেই দাঁড়িয়ে থাকবে, যা শুধু রাষ্ট্রের ঋণের বোঝা বাড়াবে, খাদ্যনিরাপত্তায় এক ছটাকও অবদান রাখতে পারবে না।




