ইনার মঙ্গোলিয়ার ১৫ মিনিটের জীবনচক্র

জীবনের কোনো না কোনো সময় আমরা পাকাপোক্তভাবে গ্রামে থাকতে চাই। কিন্তু গ্রামে তো শুধু একটি ছায়াঘেরা ভূখণ্ডে বাস করা নয়। গ্রাম তখনই বাসযোগ্য হয়, যখন মানুষগুলো একে অন্যের কাছাকাছি থাকে, দরকারের সময় কাউকে ডাকলে কাছে পাওয়া যায়, কথা বলার একটা জায়গা থাকে এবং ছোটখাটো সামাজিক সমস্যার সমাধানে দূরের কোনো দপ্তরে যেতে হয় না।
গত ১ জুলাই চীন সরকার ‘জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতি প্রসার আইন’ কার্যকর করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আইনি কাঠামোয় দেশটিতে এমন সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। এর আগেই চীনের এই একান্নবর্তী কমিউনিটির ধারণা নিয়ে বড় মাপের একটি সামাজিক নিরীক্ষা প্রকল্পও সম্পন্ন হয়েছে চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে। এতে যে সাফল্য মিলছে তার অন্যতম উদাহরণ বাওতৌ শহরের লিননান কমিউনিটি।
একসময় এলাকাটি ছিল পুরনো জীর্ণ আবাসিক ভবনে ভরা। দেয়ালে ফাটল, বর্ষায় জলাবদ্ধতা— মানুষের জীবনযাত্রা ছিল সমস্যায় ভরা। পুনর্গঠনের জন্য সেখানে তৈরি করা হয় ৯টি নতুন আবাসিক ভবন ও ৬৫৮টি বাসা। স্থাপন করা হয় শিশুযত্ন কেন্দ্র, বয়স্ক সেবাকেন্দ্র ও কমিউনিটি হাসপাতাল।
এরপর শুরু হয় আসল পরিবর্তন। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাসিন্দারা একই আবাসিক পরিবেশে বসবাস করতে শুরু করেন এবং তারা সবাই একই কমিউনিটির সুবিধা ব্যবহার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে বাহ্যিক অবকাঠামোর পাশাপাশি গড়ে উঠতে থাকে একটি অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়। কোনো একটি পরিবারের সমস্যা তখন আর শুধু ওই পরিবারের গণ্ডিতেই আটকে থাকছে না, একটি পরিবারের সমস্যা মানেই, সেটা গোটা কমিউনিটির সমস্যা।
এ কমিউনিটি গড়ে তোলার শুরুর দর্শনটা হলো— মানুষ একই এলাকায় থাকার পরও যদি তাদের স্কুল, বাজার ও বিনোদনের জায়গা আলাদা হয়, তবে যোগাযোগ বেড়ে ওঠে না। অন্যদিকে একই খেলার মাঠ, খাওয়ার জায়গা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক স্থান থাকলে মানুষের স্বাভাবিক সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সুযোগ বাড়ে।
চীনের পরিকল্পনাটিকে শুধু একটি আবাসননীতি হিসেবে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে না। এটি নগর পরিকল্পনা এবং সামাজিক সংযোগ তৈরির কৌশলও। এখানে আছে ১৫ মিনিটের জীবনচক্রের ধারণা। ধারণাটি সরল। একজন মানুষ যেন নিজের বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো পেয়ে যান, সেটাও নিশ্চিত করা হয় এতে। ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকা চাই বাজার, স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক জায়গা, খেলার মাঠ এবং মানুষের মিলিত হওয়ার জায়গা।
ইনার মঙ্গোলিয়ায় ঠিক এমনই ১৫ মিনিটের জীবনচক্র তৈরি করা হয়েছে ২৫৪টি। এর সুবিধা পাচ্ছে ৫৩৪টি কমিউনিটি, যার অধীনে রয়েছেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৬০ লাখ ৭০ হাজার মানুষ।
ধারণাটি সরল। একজন মানুষ যেন নিজের বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো পেয়ে যান, সেটাও নিশ্চিত করা হয় এতে। ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকা চাই বাজার, স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক জায়গা, খেলার মাঠ এবং মানুষের মিলিত হওয়ার জায়গা
এখানে কাছাকাছি সেবা মানে শুধু সুবিধাই নয়, এটি প্রশাসনিক দক্ষতাও বাড়াতে পারে। মানুষকে ছোটখাটো সমস্যার জন্য দূরের কোনো সরকারি অফিসে যেতে হচ্ছে না, সেবা চলে আসছে মানুষের কাছে।
চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার এই উদাহরণের অনুকরণে বাংলাদেশের গ্রামগুলোর মধ্যেও কমিউনিটির ধারণা শক্তিশালী করা সম্ভব। এ কমিউনিটি যত শক্তিশালী হবে তত বাড়বে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা। ১৫ মিনিটের জীবনচক্রের ধারণা আমাদের চলমান বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের রাস্তা দেখাতে পারে। কেননা, কমিউনিটি মানেই একধরনের সুরক্ষাবলয়। আর তেমনি সম্ভাবনা দেখা দেয় নতুন কর্মসংস্থানেরও।
ইনার মঙ্গোলিয়ার স্থানীয় হলুদ জাতের গরুকে কেন্দ্র করে একটি উদ্যোগের কথা বলা যায়। এখানে স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামের সমবায় সংগঠন এবং কৃষক— এই চার পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে। গবাদি পশু পালন থেকে শুরু করে প্রজনন, রোগপ্রতিরোধ, বিক্রি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ— পুরো একটি শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সেখানে আছে ১ হাজার ৭০টি প্রজনন সমবায়। যুক্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ৮০০ কৃষক ও পশুপালক। অর্থাৎ অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও যে মানুষকে কাছে আনে, সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারে, সেটিই প্রমাণ হয়েছে এই পাইলট প্রকল্পে।
বাংলাদেশের অনেক প্রান্তিক এলাকায় দেখা যায় কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আবার কোনো কৃষক পাচ্ছেন না ফসল কাটার লোকবল। নীতিমালার কাঠামোয় এ ধরনের সংমিশ্রিত সম্প্রদায় গড়ে তোলা হলে কেটে যেতে পারে গ্রামের চিরায়ত এসব সংকট। গ্রামের কৃষকরাই তখন সম্মিলিতভাবে নামবে বাজারজাতকারীর ভূমিকায়, সম্মিলিত শ্রমের বিনিময়ে তাদের মধ্যে গড়ে উঠবে একধরনের অলিখিত শ্রমবাজার। যেমন, ‘এ মৌসুমে আমি তোমার ধান কেটে দিচ্ছি, তো পরের মৌসুমে আমার সবজি তোলার কাজে তুমি সাহায্য করবে।’ চীনের গ্রামগুলোতে কিন্তু এ ধরনের পারস্পরিক শ্রমবিনিময় প্রায়ই চোখে পড়ে। আর এ নীতিমালার কাঠামোর ভেতর গোটা গ্রাম বা একটি এলাকা হয়ে উঠবে একটি পরিবার।
এ ধরনের পরিবার গঠনে আমাদের চেনা গণিত কাজ করে না। একে একে এখানে দুই হয় না, কিছুটা বেশিই হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একাধিক পরিবার যুক্ত হলেই কেটে যায় ভয়, অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা। তৈরি হয় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সাহস ও নতুন বাজার সম্ভাবনা।
একটি ‘পরিবারে’ যখন কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, প্রক্রিয়াজাতকারী এবং বাজার— সবাই যুক্ত থাকবে, তখন একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রও তৈরি হবে। ইনার মঙ্গোলিয়ায় কমিউনিটি পর্যায়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান কেন্দ্র, অস্থায়ী বা নমনীয় কাজের বাজার এবং অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে, যার সূত্র ধরে ২০২১-২৫ সালের মধ্যে চীনের ওই অঞ্চলে ১০ লাখ ৫৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
মানুষের মধ্যে এমন সম্পর্ক গড়তে সংস্কৃতিও একটি শক্তিশালী বন্ধন। ইনার মঙ্গোলিয়ায় ঐতিহ্যবাহী উৎসব, সংগীত, খেলাধুলা ও লোকসংস্কৃতিকে কমিউনিটির দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে অঞ্চলটির উলানচাব শহরে জাতিগত ঐক্য ও স্থানীয় ইতিহাসকে কেন্দ্র করে ১৩টি থিমভিত্তিক পার্ক এবং ২৩টি সাংস্কৃতিক করিডর তৈরি করা হয়েছে। শিলিনগোল নামের একটি এলাকার তৃণভূমিতে প্রতি বছর ২০০টির বেশি স্থানীয় ঘোড়দৌড়, মঙ্গোলীয় কুস্তি ও লোকগান উৎসবের আয়োজন করা হয়।
পুরো ব্যবস্থাটির সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশ হলো তৃণমূল শাসনব্যবস্থা। ইনার মঙ্গোলিয়ায় ছোট ছোট ভৌগোলিক এলাকা বা আবাসিক অংশকে একটি গ্রিড হিসেবে বিবেচনা করে সেখানকার জন্য নির্দিষ্ট কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের কাজ শুধু অভিযোগ শোনা নয়। তারা এলাকায় ঘুরে সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করেন, ঝুঁকি খুঁজে বের করেন, বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা করেন।
হোহোট শহরের একটি আবাসিক এলাকায় একদিন নিয়মিত পরিদর্শনের সময় এক গ্রিড কর্মী দেখতে পান, কয়েকটি টেলিযোগাযোগ তার ঢিলে হয়ে মাটির কাছাকাছি ঝুলছে। এতে পথচারীদের আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি ছিল। কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করবে, সে অপেক্ষা করা হয়নি। ওই কমিউনিটি একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে। এরপর টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, আবাসিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষসহ সবাই এসে তারগুলো গুছিয়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়।
ইনার মঙ্গোলিয়ার বিভিন্ন কমিউনিটিতে আলোচনা সভা ও পরামর্শ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাসিন্দারা সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সংস্কার, পরিবেশ উন্নয়ন, বিরোধ-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন।
চীনে এ ধরনের কমিউনিটির মানবিক বিষয়েরও দেখভাল করে। কোনো পরিবারের কেউ মারা গেলে কমিউনিটির কর্মী ও প্রতিবেশীরা তার পাশে এসে দাঁড়ান। শিলিনহোটের আইমিন কমিউনিটিতে মানবিক সহায়তার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়েছে। সেই প্ল্যাটফর্মের স্লোগান হলো, ‘এখানে এলে আপনি পরিবারেরই একজন’।
বাংলাদেশের গ্রামপর্যায়ে এ ধরনের কমিউনিটি এখনো দেখা না গেলেও বিষয়টি অসম্ভব নয়। এমনটি গড়ে তোলা গেলে গ্রামবাসীরা নিজেদের ভূমিকা, অধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগ যেমন জানতে পারবে, তেমনি বুঝতে পারবে— ব্যক্তিগত নয়, দলগত উন্নয়নই সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা




