সাধারণ মানুষের শহীদ জিয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রভাব বিস্তারে তৎপর দলীয় বুদ্ধিজীবী কিংবা দেশের আগে দলকে স্থান দেওয়া কর্মীরা সামগ্রিকভাবে একটি জাতির রাজনৈতিক গতিধারা নির্ধারণ করেন না। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ নাগরিকের ধ্যান-ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিই জাতির রাজনৈতিক বিবর্তন ও ভাগ্য নির্ধারণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কোন দৃষ্টিতে দেখে এসেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সে বিষয়ে একটি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরছি।
একজন সাধারণ বাংলাদেশির কাছে শহীদ জিয়া ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, দুর্যোগের সময় জাতির ত্রাণকর্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পতাকাবাহক এবং এমন একজন জননেতা, যিনি জাতিকে প্রগতি, উন্নয়ন ও বহুমাত্রিকতার পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
জিয়াকে ঘিরে আখ্যানের প্রথম পর্বের সূচনা ১৯৭১ সালের মার্চে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশই এ রকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ রাতে বেতারে ভেসে আসে মেজর জিয়ার সাহসী কণ্ঠস্বর। তার স্বাধীনতার ঘোষণা কোটি কোটি উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত বাংলাদেশিকে আশ্বস্ত করেছিল।
এই আখ্যানের দ্বিতীয় পর্ব মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে। একজন সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তিনি সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর প্রথম উপপ্রধান হিসেবে এর পুনর্গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
জিয়ার জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্বের সূচনা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বহুদলীয় রাজনীতি বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব সরকারের পতন ঘটে। ৩ নভেম্বরের আরেকটি অভ্যুত্থানে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হয় এবং খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এ সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হন। পরে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি মুক্ত হন। বিদ্রোহ দমনের পর রাষ্ট্রপতি সায়েমের অধীনে তাকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান এবং মাতৃভূমির নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করে জিয়া নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের গণভোটে বিজয়ের পর ১৯৭৮ সালে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
শহীদ জিয়া ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক দুর্যোগে জাতির ত্রাণকর্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পতাকাবাহক এবং এক জননেতা
১৯৭৫-৮১ সাল পর্যন্ত দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতিতে জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাক্স্বাধীনতা, সমাবেশ ও চলাচলের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেন। ব্যক্তি উদ্যোগকে উৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রীয় খাতের লোকসান কমিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন।
তার উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন। সততা, দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের ভিত্তিতে সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগও ছিল তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক।
শহীদ জিয়ার অন্যতম অবদান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেন। জোটনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি বিকাশ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা ছিল।
কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সফরকালে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে তিনি নিহত হন। পরের বছর সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। শুরু হয় তার স্বৈরশাসন। তবে শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিএনপিকে কখনো রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, সাধারণ মানুষের কাছে জিয়া কতটা জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। পুরো জাতি যেন শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ব্যাপক শোকের প্রকাশ বিরল।
শহীদ জিয়ার দেশপ্রেম, সততা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতার আদর্শ ধারণ করে তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি ১৯৯১, ২০০১ ও ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিনিক্স পাখির মতো দলটির বারবার ফিরে আসা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ জিয়ার উত্তরাধিকার এখনো প্রভাবশালী।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক উপপ্রেস সচিব



