এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ জরুরি

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গত ৫৫ বছরে এমপিওভুক্ত আধা-সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি সামষ্টিক গোষ্ঠী দেশব্যাপী তৈরি হয়েছে। এতে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চতর কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ইনস্টিটিউট রয়েছে।
একসময় এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার থেকে এমপিওভুক্তি তথা বেতন-ভাতা আদায় করে নিয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন সরকার ১০%, ২০%, ৩০% হারে এটি বৃদ্ধি করে এসেছে। যদিও শিক্ষকরা এ নিয়ে কখনো কখনো দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনও গড়ে তুলেছিলেন। এভাবেই শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্কেলের বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত সরকারি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের সমহারে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরাও শতভাগ মূল বেতনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে থাকেন।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্যসূত্রে দেশে এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩ হাজার ৪২৬। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৩৭৬টি মাধ্যমিক স্কুল, ২ হাজার ৮২৮টি কলেজ (মাউশি ও জাবি), ৫৫৭টি আলিয়া মাদ্রাসা এবং ৫২২-৬৬৫টি এমপিওভুক্ত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না
বলা চলে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন আধা-সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গৃহীত আইন ও নিয়মকানুন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। একসময় বেসরকারি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত হতো ছাত্র বেতন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী কর্তৃক অনুদানের মাধ্যমে। সে ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরে এখনো ব্যাপক সংখ্যক রয়েছে। আবার বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানাধীন, সেগুলোর কার্যক্রম একান্তই ওই সব প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্তৃপক্ষের নিয়মে পরিচালিত হয়। ফলে বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত, নন-এমপিওভুক্ত, সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে– যেগুলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে। এ ছাড়া ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কোচিং সেন্টারও রয়েছে। এমপিওভুক্ত এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুবহু একই শিক্ষাক্রম অনুসরণ করলেও অন্যান্য ধারার সমস্তরের প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অনুসৃত শিক্ষাক্রম পঠন-পাঠনে কার্যকর করে থাকে। উল্লিখিত বিভিন্ন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পঠন-পাঠনের মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান, সহশিক্ষা কার্যক্রমে রয়েছে বিস্তর বৈষম্য। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার পরিবেশ যথাযথভাবে উপস্থিত নয় এবং এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তকরণের ধারণাটি কোনো সরকারই সুনির্দিষ্ট আইন, নিয়মকানুন, বিধিবিধান ও শর্ত পরিপূর্ণ করার মাধ্যমে কার্যকর করার ক্ষেত্রে আগ্রহী ছিল না। বেশিরভাগ বেসরকারি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকালেই আর্থিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক অভাব ও স্বল্পতা ছিল এবং যোগ্য শিক্ষকেরও যথেষ্ট অভাব ছিল। মূলত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রদানের সক্ষমতা বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই ছিল না। সরকারি অনুমোদন এবং এমপিওভুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে যোগ্য শিক্ষক প্রতিষ্ঠানে আসার আগ্রহ খুব সীমিত আকারে দেখাতেন। এরপর বেতন যত বাড়তে থাকে, এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরিপ্রার্থীও বাড়তে থাকে। এতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় নেতাদের প্রভাবও বাড়ে। যোগ্যতা না থাকার পরও দলীয় অনুগত থাকা কিংবা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ লাভের ঘটনা বিভিন্ন সময় সামনে আসে। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। সেটিকেও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি চালু থাকায় এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তুলনামূলকভাবে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতনের মূল অংশ এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুযোগ-সুবিধা সরকারি কোষাগার থেকে প্রদান করা হচ্ছে, তাই এ ক্ষেত্রে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এযাবৎকালে এখনো সন্তুষ্টির উচ্চ পর্যায়ে যায়নি। তাই সরকারকে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হবে পেছনে ফেলে আসা দুর্বলতা এবং ত্রুটিগুলো কীভাবে দ্রুত নিরসন করা যায়। কেননা, অতীতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক চাপ কিংবা মহলবিশেষের ইচ্ছা পূরণ বিশেষভাবে কাজ করেছিল। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অবকাঠামগত সুবিধা, শিক্ষক ও অন্যান্য লোকবলের অবস্থান উপেক্ষিত হয়েছিল। এমনকি নিকটবর্তী অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছিল। ফলে এমপিওভুক্ত হয়েছে এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা জিইয়ে রেখেছে পরিচালনা পর্ষদ। পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি অর্থের প্রাচুর্য থাকে, তাহলে পরিষদের অনেক কর্মকর্তা অর্থ লোপাটের ব্যবস্থা করে থাকেন; নানা দিবস উদযাপনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের আপ্যায়নসহ নানা ধরনের অর্থ ব্যয়ের ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে। অতীতে যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এদের হস্তক্ষেপ সীমাহীন পর্যায়ে চলে যেত। এখনো পরিচালনা পর্ষদের পদ-পদবি নিয়ে কাড়াকাড়ি ও মারামারির ঘটনা বিরল নয়। সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব বহিরাগত কিংবা পরিচালনা পর্ষদের অনৈতিক প্রভাববিস্তারের আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সক্রিয় দলীয় রাজনীতি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা উচিত। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি নিয়মে বদলির ব্যবস্থা অনুসরণ করা যেতে পারে। শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা অতীবও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ধীরে ধীরে অপেক্ষাকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারীকরণের নিয়মনীতি চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। এর ফলে আর্থিক ব্যয় খুব একটা সরকারের কাঁধে চাপ সৃষ্টি করবে না। কিন্তু মাধ্যমিক স্তর থেকে ওপরের দিকে ক্রমে কাম্য সংখ্যক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনায়াসে দেশে বৃদ্ধি পেতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক





